পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের র‌্যালির দিন পতনের শিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান

রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition
পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের র‌্যালির দিন  পতনের শিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান
পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের র‌্যালির দিন পতনের শিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় খাত ব্যাংক। বাজারের স্বাভাবিক অবস্থায় সচরাচর এ খাতেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি থাকে। কারণ খাতটি যেমন- বাজার মূলধনের একটি বড় অংশ দখল করে আছে তেমনি বাজারের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করে স্বল্পসময়ের বিনিয়োগে এ খাত থেকেই বেশি মুনাফা তুলে নিতে পারে। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি অংশও এ খাতে নিজেদের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন। ফলে বাজারের স্বাভাবিক অবস্থায় সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের জন্যই এ খাতই হয়ে ওঠে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খাত।

আর্থিক খাতের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এ খাতটি থেকে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু সম্প্রতি এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। এ খাতের বেশ কিছু কোম্পানি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মুনাফা করার মতো তথ্য প্রকাশ করলে গত কয়েক দিন থেকে খাতটির প্রতি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধি দুই দিক থেকেই এগিয়ে ছিল খাতটি। অপর দিকে ব্যাংকিং খাতের এই র‌্যালির দিন বাজারগুলোতে ব্যাপকভাবে দরপতনের শিকার হয় ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

ব্যাংকিং খাতের এ মূল্যবৃদ্ধি গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকেরই উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৯ দশমিক ০৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৪ হাজার ৯৫৩ দশমিক ৬০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৯২ দশমিক ০৯ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৮৪ ও ৩ দশমিক ৯০ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০৮ দশমিক ০৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১২২ দশমিক ৬৯ ও ৭৬ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল উন্নতি ঘটে লেনদেনেও। ঢাকা শেয়ারবাজার এ দিন ৪৬৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১১ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৪৫৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন পৌঁছে ১২ কোটিতে।

এ দিকে দীর্ঘদিনের ভালো শেয়ারের খরা কাটাতে এবং পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে ১০টি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল ৭ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সাথে বৈঠকে বসেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে মূলত লাভজনক এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়ার বিষয়ে তাদের উৎসাহিত করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে- তালিকাভুক্তির জন্য প্রাথমিকভাবে যে ১০টি কোম্পানিকে নির্বাচন করা হয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি পুরোপুরি সরকারি মালিকানাধীন এবং কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি, যেখানে সরকারের সামান্য অংশীদারিত্ব রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা এসব কোম্পানির প্রধানদের কাছ থেকে শুনবেন যে বাজারে আসতে তাদের কী কী সুবিধা বা নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাজারে আনার বিষয়টি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

বৈঠকে আমন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর তালিকায় রয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি এবং সিলেট গ্যাসফিল্ডস লিমিটেড। এ ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ, নেসলে বাংলাদেশ, সিনজেন্টা বাংলাদেশ, সিনোভিয়া বাংলাদেশ এবং নোভারটিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এসব কোম্পানিকে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে শেয়ার ছাড়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

২০২৫ সালের ১১ মে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয়ার যে দিকনির্দেশনা দেন তারই অংশ ছিল এসব কোম্পানিকে দ্রুততম সময়ে তালিকাভুক্ত করা। কিন্তু এরপর আট মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেরিতে হলেও এই পরিস্থিতিতে ইউনিলিভার বা নেসলের মতো ‘ব্লু-চিপ’ কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে এলে তারল্য সঙ্কট কাটবে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূলত মানসম্পন্ন আইপিওর অভাব মেটাতেই সরকার এখন সরাসরি লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর দরজায় কড়া নাড়ছে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬ লাখ ৯৮ হাজর শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকায় ৭৭ লাখ ২৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকিং কোম্পানি সিটি ব্যাংকের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, উত্তরা ব্যাংক, মালেক স্পিনিং, লাভেলো আইসক্রিম, যমুনা ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও রবি আজিয়াটা।

দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল এনআরবি ব্যাংক। এটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এসবিএসি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, আরএকে সিরামিকস, লাভেলো আইসক্রিম, জিকিউ বলপেন, সমতা লেদার ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক।

দরপতনের দিক থেকে দিনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ফারইস্ট ফিন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারায় এ দুই কোম্পানি। ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এফএএস ফিন্যান্স। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, পিপলস লিজিং, আরএসআরএম স্টিলস, বিআইএফসি, জিএসপি ফিন্যান্স ও ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।