সোনালী ব্যাংক সিবিএতে কোন্দল চরমে

পাল্টাপাল্টি কমিটি ও বহিষ্কার কার্যালয়ে তালা দিলো প্রশাসন

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক পিএলসির প্রধান কার্যালয়ে দলীয় প্রভাব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এক নজিরবিহীন ও চরম রূপ ধারণ করেছে। ব্যাংকটির সিবিএ (কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট) তথা এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের কর্তৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এই উত্তেজনার জেরে রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অষ্টম তলায় সিবিএ কার্যালয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন দাফতরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।

সূত্র মতে, সোনালী ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে সিবিএ এবং কর্মচারী রাজনীতিতে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন বিরোধ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পটপরিবর্তন ও নতুন সমীকরণের সুযোগে ব্যাংকে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে শ্রমিক দল ও বিএনপি সমর্থিত কর্মচারী সংগঠনগুলো। দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থিতরা নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চাইছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর সোনালী ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনে (সিবিএ) রেজি নং-বি ৬৬৪ মো: জাকির হোসেনকে সভাপতি এবং মাহবুব হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু চলতি বছরের ৮ জুন নানা অভিযোগ এনে কমিটির ২৮ জন সদস্য সভাপতির বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অনাস্থা প্রকাশ করে। তাদের অভিযোগ, সভাপতি বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সিনিয়রদের সাথে দুর্ব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎসহ নানা জাল-জালিয়াতির সাথে জড়িত। এতে সিবিএর পাশাপাশি সরকারি দল বিএনপির সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ০৯ জুন তারিখে কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে না তার কারণ দর্শানোর জন্য সাত দিনের সময় দিয়ে নোটিশ প্রদান করা হয়। নির্ধারিত সময়ে অভিযোগের বিষয়ে জবাব না দেয়ায় ১৮ জুন সিবিএর কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে বর্তমান সভাপতিকে সর্বসম্মতভাবে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মো: মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে এই বহিষ্কারের নোটিশ শ্রম অধিদফতর, শ্রমিক দলসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়।

অন্য দিকে দেখা যায় গত ২৪ জুন একপত্রের মাধ্যমে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেছেন সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মো: মাহবুব হোসেন। পত্রে তিনি বলেছেন, কমিটির ১৩ জন পদোন্নতি পাওয়ায় এবং চারজন অবসর গ্রহণ করায় শ্রম আইনের ১৮০(১)-খ ধারা মতে এদের থেকে ১০ শতাংশের বেশি থাকতে পারবে না। কিন্তু এই ১৭ জনই সংগঠনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করায় তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। তবে এই পদত্যাগ পত্রটি নিয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান মাহবুব হোসেন। তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে বলেন, যেখানে আমরা সবাই সভাপতিকে বহিষ্কার করেছি, সেখানে আমি সভাপতি বরাবর কোনো পদত্যাগপত্র দেয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। তিনি নিজেই তো অবৈধ। আমার স্বাক্ষর জাল করে বহিষ্কৃত সভাপতি এটি করছেন।

এ দিকে সিবিএর ২৮ জনের স্বাক্ষরিত অনাস্থা, বহিষ্কারাদেশের সিদ্ধান্তকে আমলে না নিয়ে পদোন্নতি, অবসরে যাওয়া ১৭ জন ও সংগঠন বিরোধী কাজে জড়িত থাকায় তিনজন বাদ দিয়ে ২০ জনকে কো-অপ্ট করে নতুন করে কমিটি পুনর্গগঠন করেন সিবিএর সভাপতি দাবিদার মো: জাকির হোসেন। এই কমিটি অনুমোদনের জন্য শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম, শ্রম অধিদফতর এবং ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রেরণ করেন। জানা গেছে, শ্রমিক দলের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কমিটিকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। যদিও এক পক্ষ বলছে, পুনর্গঠিত কমিটিকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা শ্রমিক দলের কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে। আর প্রতিপক্ষরা বলছেন, শ্রম অধিদফতর কর্তৃক বৈধ কমিটিকেই পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেছেন।

এ দিকে সিবিএর সভাপতি জাকির হোসেন কর্তৃক ১২ আগস্ট গঠিত কমিটির কোনো বৈধতা নেই বলে জানিয়েছেন ২০২৪ সালে গঠিত কমিটির সদস্যরা। তাদের মতে, ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি শ্রম অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত সিবিএর ৩০ জনের যে কমিটি প্রত্যায়িত হয়েছে, সেটিই বৈধ কমিটি। যেহেতু কমিটির ২৮ জন সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে স্বাক্ষর দিয়েছে, তাই, কমিটিতে বর্তমান সভাপতি হিসেবে জাকির হোসেন নেই। এ ছাড়া দুর্নীতি, অর্থআত্মসাৎ, জাল জালিয়াতি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে তাকে যথাযথ নিয়ম মেনেই বহিষ্কার করা হয়েছে।

জানতে চাইলে সিবিএর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে কমিটির ২৮ জনই লিখিতভাবে অনাস্থা জানিয়েছে। তিনি এখন বহিষ্কৃৃত। তিনি ছাড়া বাকি সবাই কমিটির বৈধ সদস্য। শ্রম আইন অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সভাপতির কার্যক্রমসহ ঘোষিত তথাকথিত নতুন পুনর্গঠিত কমিটি অবৈধ। তিনি বলেন, ব্যাংকের সবাই ক্লিন ইমেজ, শিক্ষিত, ভদ্র ও কর্মী বান্ধব নেতৃত্ব দেখতে চায়। কোনো দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ বা অফিসারদের সাথে খারাপ আচরণ করে, এমন কাউকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেনে নেবে না।

ব্যাংকের ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, এই দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সিবিএর নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ। সূত্রের দাবি, এই দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে সম্প্রতি প্রধান কার্যালয়ের অভ্যন্তরে দফায় দফায় উত্তেজনা, বহিরাগতদের অবস্থান এবং বাগি¦তণ্ডার ঘটনা ঘটে। এক পক্ষ অপর পক্ষকে সিবিএ কার্যালয়ে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে কর্তৃপক্ষ গত ১৭ আগস্ট অষ্টম তলায় অবস্থিত সিবিএ (এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন) কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত সিবিএ অফিস বন্ধ থাকবে বলে নোটিশে জানানো হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্যাংকের ভেতরে ও মূল ভবনের সামনে উভয় পক্ষের অনুসারীরা নিয়মিত অবস্থান নিয়ে মহড়া দিচ্ছে। উভয় পক্ষের লোকজনই প্রশাসনের সাথে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে দফায় দফায় বৈঠক করছে এবং নিজেদের বৈধ কমিটি বলে জানান দিচ্ছে। সিবিএর এই রাজনৈতিক দলাদলি, ব্যাংকের অভ্যন্তরে দফায় দফায় মহড়া ও কার্যালয়ে তালা দেয়ার কারণে দৈনন্দিন ফাইল ছাড় করা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। কর্মকর্তারা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিএনপি সমর্থিত সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখানো, জোরপূর্বক বিভিন্ন দলিলে বা স্ট্যাম্পে সই নেয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে চাঁদাবাজি, মারধর এবং জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে সোনালী ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের (সিবিএ) সভাপতি এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগের বিষয়ে সিবিএর সভাপতি এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: জাকির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে গঠিত সোনালী ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের (সিবিএ) কমিটির ১৩ কর্মকর্তা পদোন্নতি পাওয়া ও চারজন অবসরে যাওয়ার কারণে শ্রম অধিদফতরের আইন অনুযায়ী কমিটি পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় দেখা দেয়। ব্যাংকের কর্মচারীরা আমাকে চায় এবং পুনর্গঠিত কমিটিতে সাবেক কমিটির ১০ জন নেতৃবৃন্দ রয়েছেন। তিনি বলেন, পুনর্গঠিত কমিটি শ্রমিক দল অনুমোদন দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি কোনো বহিরাগত নিয়ে ব্যাংকে যাইনি। আমার বিরুদ্ধে আনা চাঁদাবাজিসহ সব অভিযোগই মিথ্যা ও সাজানো। তিনি তার বিরুদ্ধে দেয়া কারণ দর্শনোর কোনো নোটিশ পাননি বলে জানান। একইসাথে অনাস্থা ও বহিষ্কারের বিষয়টিও সাজানো এবং শ্রম আইন বিরোধী বলে মন্তব্য তার। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের বসানো প্রশাসনের সাথে ব্যাংকের স্টাফদের বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে তিনি কড়া ভাষায় কথা বলেছেন। তবে বাজে ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না।

শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা চাই, সবাই মিলে মিশে থাকুক। আমরা দলের পক্ষ থেকে পুনর্গঠিত একটি কমিটির অনুমোদনের সুপারিশ করেছি। এই কমিটি নতুন করে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কাজ করবে। সভাপতির প্রতি অনাস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রম আইনে অবসরে গেলেও কমিটিতে থাকার সুযোগ রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো: শওকত আলী খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সোনালী ব্যাংক জনগণের আস্থার ব্যাংক। সবার আগে ব্যাংকের নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিৎ করা আমার দায়িত্ব। এখানে কোনো রকমের বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। কিন্তু সম্প্রতি ব্যাংকের ভেতরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে আমরা সিবিএ অফিসে তালা লাগোনোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এটি তালাবদ্ধ থাকবে। ব্যাংকে কোনো ধরনের অচলাবস্থা সহ্য করা হবে না। তিনি বলেন, সিবিএ’র এক শীর্ষ নেতার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি যেভাবে ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সাথে বাজে ব্যবহার করেন, সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সোনালী ব্যাংকে দলের নাম ভাঙিয়ে আধিপত্য বিস্তার ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। জাতীয়বাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ^াস এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে আধিপত্য বিস্তার ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। সোনালী ব্যাংকের বিষয়টির নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।