- মুসাব্বির হত্যায় জড়িত থাকতে পারে জেলফেরত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী
- সিসিটিভি ফুটেজে দুই ঘাতককে শনাক্ত
আমিনুল ইসলাম
রাজধানীর কাওরান বাজারের কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে। যার পেছনে জেলফেরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম ও নিরবের ইন্ধন থাকতে পারে। কারণ বেহাত হওয়া কাওরান বাজারকে ফের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ওই সন্ত্রাসীচক্র। এমনটি ধারণা করছেন নিহতের সতীর্থরা।
পুলিশের ধারণা, চাঁদাবাজি ও দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। এর সাথে কারা জড়িত সে ব্যাপারে এখনো স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যার সাথে জড়িত দুজনকে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের নাম পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদি হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৪/৫ জনকে আসামি করা হলেও কারোর নাম উল্লেখ করা হয়নি। সুরাইয়া বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার না হলে আমার মতো অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।
প্রত্যদর্শীদের বরাত দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আব্দুল মজিদ মিলন জানান, বুধবার রাত ৮টার দিকে কাওরান বাজারের স্টার গলিতে মুসাব্বির ও আনোয়ার চা পান করছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা কয়েকজন দুর্বৃত্ত এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রত্যদর্শীরা জানায়, সন্ত্রাসীরা পর পর পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করে। ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকেন দুজন। যার একজন ছিলেন মুসাব্বির। অপরজন কাওরানবাজার ভ্যান সমিতির নেতা আবু সুফিয়ান মাসুদ। আশপাশের লোকজন তাদের উদ্ধার করে কাছের এক হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
পুলিশের সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসেছিল দুই দুর্বৃত্ত। স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বিরকে দেখামাত্র বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করে তারা। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আবার উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মুসাব্বির। এ সময় তার মোবাইল ফোন পড়ে যায়। শুটাররা সেই ফোন নিয়েই পালিয়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিহত মুসাব্বিরের রাজনৈতিক কয়েকজন সহকর্মী জানান, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির দল থেকে বহিষ্কার হলেও জনপ্রিয়তার কারণে মাঠ ছাড়তে পারেননি। দলের দুঃসময়ে তিনি প্রতিটি কর্মীর সাথে ছিলেন। যার কারণে কিছু ভুল বোঝাবুঝিতে তাকে বহিষ্কার করা হলেও কর্মীরা তাকে ছেড়ে যায়নি। আর এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ কাওরান বাজারের এক সময়কার নিয়ন্ত্রক একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে। যার জন্য বাধা হয়েছিল এই মুসাব্বির। সেই বাধা দূর করতেই তাকে হত্যা করা হতে পারে। হয়তো সামনে আরো অনেকেই এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে।
নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘বুধবার সন্ধ্যায় তিনি আমাকে বললেন, একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে বের হবো। ওইটাই ছিল শেষ কথা। তিনি যখন বাইরে যান প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বাসায় ফোন দেন না। কাজ শেষ করে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বাসায় ফেরেন। সম্প্রতি মুসাব্বির বাসায় ফিরে প্রায় বলতো তার অনেক শত্রু দাঁড়িয়ে গেছে। তারা আমাকে ভালোভাবে কাজ করতে দিবে না। হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে। এ জন্য তিনি একা বের হতেন না।’ সুরাইয়া বলেন, ‘২০ বছর ধরে পানির ব্যবসা করে আসছিলেন মুসাব্বির। প্রথমে সরাসরি জড়িত থাকলেও রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর লোক দিয়ে এই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ব্যবসা নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকার কথা না। হত্যার বিচার দাবি করে সুরাইয়া বলেন, ‘সিসিটিভির ফুটেজ রয়েছে। এসব দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জরুরি পদপে নিলে প্রকৃত হত্যাকারী বের হয়ে আসবে।’ তিনি আরো বলেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে আমার মতো অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা বলেন, নিহতের স্ত্রী বাদি হয়ে থানায় একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় নাম না জানা অজ্ঞাতপরিচয় ৩-৪ জনের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করতে পুলিশের কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে দুজনের উপস্থিতি চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এখনো তাদের শনাক্ত করে নাম পরিচয় উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের আরো কিছু কাজ বাকি রয়েছে। যা সম্পন্ন হলে জড়িতদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।



