- অর্থের আকার : কেন টেন্ডার এত গুরুত্বপূর্ণ
- এই অর্থ কোথায় যায়?
- সিন্ডিকেট কিভাবে তৈরি হয়
- প্রকল্প থেকে রাজনীতি : অর্থের চেইন মাঠের কেস স্টাডি
- কেন টেন্ডার মানে ‘রাজনৈতিক শক্তি’
- গণতন্ত্রের ঝুঁকি এবং আইন ও বাস্তবতার ফাঁক
নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জেলার একটি ছোট্ট শহরে হঠাৎ করেই শুরু হয় উন্নয়ন কাজের জোয়ার। রাস্তা খোঁড়া, ড্রেনেজ নির্মাণ, স্কুল ভবন সংস্কার- সব কিছু যেন এক সাথে। কয়েক মাস আগেও যেসব প্রকল্প কাগজে ছিল, সেগুলো দ্রুত টেন্ডার হয়ে কাজে নেমে যায়। স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি ‘উন্নয়ন’ হলেও প্রশাসনের ভেতরের একটি সূত্র বলছিল ভিন্ন গল্প- ‘এখন কাজের সময় না, এখন নির্বাচনের সময়। কাজ মানেই ফান্ড।’
এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক নীরব বাস্তবতা- সরকারি টেন্ডার শুধু উন্নয়ন নয়, নির্বাচনী অর্থনীতিরও জ্বালানি।
বিগত এক দশকে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা ডিজিটাল হয়েছে, ই-জিপি চালু হয়েছে, নিয়মকানুন কঠোর হয়েছে- তবুও মাঠপর্যায়ে ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’ শব্দটি আরো বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ টেন্ডার এখন কেবল ব্যবসায় নয়, এটি ক্ষমতার উৎস, নির্বাচনী তহবিলের জোগানদার, রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা মানে শুধু ব্যবসায় পাওয়া নয়- এর অর্থ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ক্ষমতা, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। কারণ বাংলাদেশে নির্বাচনের বড় অংশই এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই অর্থের বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’।
বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন, টেন্ডার-নির্বাচন একটি নেক্সাস বা অশুভ চক্র। অর্থাৎ- সরকারি প্রকল্পের অর্থ ও নির্বাচনী রাজনীতির পারস্পরিক নির্ভরতা।
অর্থের আকার : কেন টেন্ডার এত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এখন কয়েক লাখ কোটি টাকার। সড়ক, সেতু, ভবন, আইসিটি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য- সব খানেই বিশাল ব্যয়। এই বিপুল অর্থের বড় অংশই যায় টেন্ডারের মাধ্যমে।
অর্থনীতিবিদদের হিসাব বলছে, যদি মোট প্রকল্প ব্যয়ের মাত্র ৫-১০ শতাংশও ‘অতিরিক্ত ব্যয়’, কমিশন বা কারসাজিতে চলে যায়, তা হলে সেটি হাজার হাজার কোটি টাকার সমান।
এই অর্থ কোথায় যায়?
সরকারি নথিতে তার উল্লেখ নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে- এই অর্থের একটি অংশ ঘুরে যায় রাজনৈতিক তহবিলে। ই-জিপি চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগিতা বাড়ানো। কিন্তু ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদারই পাচ্ছে অধিকাংশ বড় প্রকল্প, বহু টেন্ডারে বিডার মাত্র এক-দুইজন আর একই গ্রুপের কোম্পানির পুনরাবৃত্তি ঘটে। অর্থাৎ- বাজারে কার্যত ‘কনসেনট্রেশন’ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি শক্তিশালী গ্রুপ টেন্ডার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
এক সাবেক ক্রয়বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যেখানে প্রতিযোগিতা নেই, সেখানে দাম কমবে না। আর যেখানে দাম কমে না, সেখানে বাড়তি টাকা কোথাও না কোথাও যায়।’
সিন্ডিকেট কিভাবে তৈরি হয়
টেন্ডার সিন্ডিকেট সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে- প্রথমত, বাজার নিয়ন্ত্রণ : প্রভাবশালী ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে এলাকা বা প্রকল্প ভাগ করে নেয়। কেউ সড়ক, কেউ ভবন, কেউ আইসিটি। দ্বিতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বী ঠেকানো : ছোট ঠিকাদারদের ভয়ভীতি, রাজনৈতিক চাপ, বা ‘কভার বিড’ দিয়ে প্রতিযোগিতা কমানো। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক প্রভাব : দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয় যাতে নির্দিষ্ট গ্রুপ ছাড়া অন্যরা যোগ্য না হয়। ফলে টেন্ডার কাগজে ওপেন হলেও বাস্তবে ‘পূর্বনির্ধারিত’ হয়ে যায়।
প্রকল্প থেকে রাজনীতি : অর্থের চেইন
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি সুস্পষ্ট অর্থচক্র- ধাপ ১ : ঠিকাদার বড় প্রকল্প পায়; ধাপ ২ : প্রকল্প মূল্যের একটি অংশ ‘কমিশন/কাটমানি’; ধাপ ৩ : এই অর্থ স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকের কাছে যায়; ধাপ ৪ : নির্বাচনের সময় তা ব্যবহার হয়- প্রচারণা, কর্মী নিয়োগ, পরিবহন ও ভোট ব্যবস্থাপনা।
এক ঠিকাদার বলেন, ‘কাজ পেলে নির্বাচনের সময় সহযোগিতা করতেই হয়’। অর্থাৎ- টেন্ডার লাভ মানে নির্বাচনী ফান্ড।
মাঠের কেস স্টাডি
কেস ১ : জেলা সড়ক উন্নয়ন : নির্বাচনের ছয় মাস আগে ৩০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ শুরু। ঠিকাদার স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ। কাজের সাথে যুক্ত শতাধিক শ্রমিক পরে দেখা যায় প্রার্থীর মিছিল-মিটিংয়ে।
কেস ২ : শিক্ষা ভবন নির্মাণ : একই গ্রুপ তিনটি আলাদা কোম্পানি দিয়ে বিড করে। তিনটিই আত্মীয়স্বজনের নামে। কাজ পায় তাদেরই একটি প্রতিষ্ঠান।
কেস ৩ : আইসিটি সরঞ্জাম : উচ্চমূল্যে কেনা কম্পিউটার কয়েক মাসেই নষ্ট। কিন্তু বিল সম্পূর্ণ উত্তোলন। অভিযোগ- গুণগত মানের চেয়ে দ্রুত অর্থ উত্তোলনই ছিল লক্ষ্য।
কেন টেন্ডার মানে ‘রাজনৈতিক শক্তি’
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করলে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ে কয়েকভাবে : ক. নগদ অর্থের প্রবাহ : সরকারি উন্নয়ন বাজেট হাজার হাজার কোটি টাকা। যদি ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয়/কমিশন হয়, সেটিই কয়েক শ’ কোটি টাকা ‘অফ-দ্য-বুক’ অর্থ। এই অর্থ দলীয় কার্যক্রমে, প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচে এবং ভোট কেনাবেচায় ব্যবহার হয়।
খ. কর্মী-নেটওয়ার্ক তৈরি : ঠিকাদাররা প্রকল্পে স্থানীয় শ্রমিক/সাপ্লায়ার নিয়োগ করে। নির্বাচনের সময় তারা হয়ে যায়- মিছিলের লোক, ক্যাম্পেইন টিম ও ভোটের দিন মাঠকর্মী। অর্থাৎ- প্রকল্প মানে রেডিমেড রাজনৈতিক মেশিনারি।
গ. প্রশাসনিক প্রভাব : যে গ্রুপ নিয়মিত সরকারি কাজ পায়, তারা স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফলে বিরোধী দলের সভা বাধাগ্রস্ত, মাঠ দখল, পোস্টার লাগাতে বাধা, এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।
ডেটা দিয়ে প্রভাব বোঝা
রিপোর্টে দেখা যায়- শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার পেয়েছে ৬০ শতাংশ + প্রকল্প, অনেক টেন্ডারে একক বিডার, একই গ্রুপ বারবার কাজ পাচ্ছে। এটার রাজনৈতিক অর্থ কী? এর মানে বাজারের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত আর তারা সাধারণত ক্ষমতাসীন বা শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্লকের সাথে যুক্ত। ফলে অর্থনৈতিক মনোপলি থেকে রাজনৈতিক মনোপলি তৈরি হয়।
নির্বাচনকালে বাস্তব চিত্রটা এমন- জেলা পর্যায়ে সাধারণত দেখা যায়, নির্বাচনের আগে হঠাৎ রাস্তা/স্কুল/ড্রেনেজ প্রকল্প শুরু হয়, ঠিকাদাররা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায়, ‘উন্নয়ন করেছি’ ব্যানারে প্রার্থীর ছবি সাঁটানো হয়, প্রকল্প শ্রমিকরা ভোটের দিন মবিলাইজেশন টিম হিসেবে কাজ করে।
একজন সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, ‘যে ঠিকাদাররা কাজ পায়, তারাই নির্বাচনের সময় প্রার্থীর সবচেয়ে বড় স্পন্সর।’
কেন টেন্ডার মানে রাজনৈতিক শক্তি
নগদ প্রবাহ : প্রকল্প মানেই বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন। নির্বাচনকালে এই নগদই প্রধান অস্ত্র। সংগঠিত নেটওয়ার্ক : ঠিকাদারদের শ্রমিক-সাপ্লায়ার-স্থানীয় ব্যবসায়ী- সবাই মিলে তৈরি হয় রাজনৈতিক ‘ক্যাডার বেস’। প্রশাসনিক সম্পর্ক : নিয়মিত কাজ পেলে প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, যা মাঠে প্রভাব বিস্তারে কাজে লাগে।
নির্বাচনে সরাসরি প্রভাবটা হয় এমন- ১. অসম প্রতিযোগিতা : যার কাছে বেশি টেন্ডার তার কাছে বেশি টাকা এবং তার প্রচারণা বেশি। ফলে ছোট বা নতুন প্রার্থী টিকে থাকতে পারে না। ২. কালো টাকার ব্যবহার : অফিসিয়াল ব্যয়ের সীমা থাকলেও বাস্তবে খরচ হয় কয়েকগুণ বেশি। ৩. নীতি বিকৃতি : নির্বাচনের পর যোগ্যতার বদলে ‘লয়্যাল’ ঠিকাদার কাজ পায় এবং আবার সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়। এটি হয়ে যায় একটি চক্র। টেন্ডার থেকে ফান্ডিং সেখান থেকে নির্বাচন জেতা এরপর আবার টেন্ডার প্রাপ্তি।
অর্থনীতি ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, টেন্ডার সিন্ডিকেট শুধু আর্থিক অপচয় নয়, এটি নির্বাচনী সমতা নষ্ট করার নীরব অস্ত্র। যত দিন সরকারি প্রকল্প থেকে রাজনৈতিক অর্থায়নের এই অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রবাহ বন্ধ না হবে, তত দিন ‘সমান সুযোগের নির্বাচন’ কাগজে-কলমেই থাকবে। অতএব, টেন্ডার সংস্কার মানে কেবল অর্থনৈতিক সুশাসন নয়- এটি সরাসরি গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন।
গণতন্ত্রের ঝুঁকি এবং আইন ও বাস্তবতার ফাঁক
বিশ্লেষকদের মতে, এ ব্যবস্থা তিনভাবে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে, নতুন বা ছোট প্রার্থী প্রতিযোগিতা করতে পারে না; নির্বাচনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়; সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
একজন নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, ‘এটি উন্নয়ন নয়, এটি পলিটিক্যাল ইনভেস্টমেন্ট’।
নিয়ম আছে- স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, অডিট। কিন্তু সমস্যা হলো- মালিকানা যাচাই নেই, স্বার্থ-সঙ্ঘাত ধরা পড়ে না, শাস্তির নজির কম আর রাজনৈতিক অর্থায়ন অস্বচ্ছ। এর ফলে আইন থাকলেও কার্যকারিতা কম।
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এ অবস্থায় কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এর আওতায়- রাজনৈতিক অর্থায়ন স্বচ্ছ করা এবং দল ও প্রার্থীর তহবিলের অডিট বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ প্রকাশ করা যেতে পারে যাতে একই মালিকের একাধিক কোম্পানি বিড করতে পারবে না। কম বিডার হলে পুনঃটেন্ডার করে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রকল্প ব্যয় ড্যাশবোর্ড করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে- একই সাথে নির্বাচনকালীন প্রকল্পে বিধিনিষেধ আরোপ করে ভোটের আগে হঠাৎ উন্নয়ন ঘোষণায় নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
সামনে পথ
বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় পার করছে। সংস্কার, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা- সবই আলোচনায়। কিন্তু টেন্ডার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না এলে নির্বাচনী সমতা নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ- উন্নয়নের টাকা যদি রাজনীতির পেছনে যায়, তাহলে উন্নয়নও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, গণতন্ত্রও।
মনে রাখতে হবে- টেন্ডার সিন্ডিকেট কেবল অর্থনৈতিক অপচয়ের গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, প্রভাব, নির্বাচন- সব কিছুর সাথে জড়িত একটি কাঠামোগত সমস্যা। সরকারি প্রকল্পের টাকা যখন নির্বাচনী তহবিলে রূপ নেয়, তখন ভোটের মাঠ আর সমান থাকে না।
স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা তাই শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়- এটি গণতন্ত্র রক্ষার পূর্বশর্ত। নচেৎ উন্নয়ন প্রকল্প চলবে, রাস্তা হবে, ভবন উঠবে; কিন্তু নির্বাচনের মাঠে অদৃশ্য অর্থের খেলাই জিতে যাবে।



