আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১৮-তে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। উত্তরা, তুরাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও খিলক্ষেত এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনটি ভোটের সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এবারের নির্বাচনে এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে। মাঠপর্যায়ের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, একপক্ষ শোডাউন ও মিছিলে সরব, আর অন্যপক্ষ ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
বিএনপি বনাম এনসিপির গণসংযোগ
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন শুরু থেকেই বড় শোডাউন ও মিছিলের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। বাজার-ঘাট ও রাজপথে তার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দলের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি এ প্রচারণাকে আরো গতিশীল করেছে।
অন্যদিকে, প্রচলিত রাজনৈতিক হট্টগোলের বাইরে গিয়ে ভিন্নধর্মী কৌশলে মাঠে নেমেছেন জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ও এনসিপি নেতা আরিফুল ইসলাম আদিব। বড় ব্যানার, মাইকিং বা শোডাউনের পরিবর্তে তিনি ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইনে জোর দিচ্ছেন। এনসিপি নেতাদের ভাষায়, এটি একটি ‘শান্ত, নৈতিক ও জনসম্পৃক্ত’ প্রচারণা।
আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ‘এই নির্বাচন শুধু পোস্টার আর মিছিলের নয়; মানুষের আস্থা অর্জনের। আমরা হইচই নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে চাই।’
ভোটারদের ভাবনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দুই ধরনের প্রচারণাই ভোটারদের মধ্যে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। উত্তরা সেক্টর-১০ এলাকার মুদিদোকানি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই জাহাঙ্গীর হোসেন বা তার লোকজন এলাকায় আসছেন। তবে মানুষ এখন এমন নেতৃত্ব চায়, যারা শুধু ভোটের সময় নয়, সবসময় পাশে থাকবে।’
এনসিপির ‘নীরব কিন্তু গভীর’ প্রচারণা তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলছে। তুরাগ এলাকার এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিক হাসান বলেন, ‘আমরা নতুন নেতৃত্ব চাই। শুধু বড় শোডাউন দিয়ে হবে না, আমাদের কথা শুনতে হবে। এনসিপির প্রার্থীর বার্তাগুলো তরুণদের আকর্ষণ করছে।’
তবে প্রবীণ ভোটারদের একাংশ এখনো পরিচিত মুখের ওপর আস্থা রাখতে চাইছেন। খিলক্ষেত এলাকার অটোরিকশা চালক মো: মোকাম্মেল বলেন, ‘বিএনপি প্রার্থীকে আমরা বহুদিন ধরে চিনি। জামায়াত জোটের প্রার্থী নতুন হলেও তরুণরা তাদের পরিবর্তনের কথায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
বাধা বিপত্তি ও এনসিপির অভিযোগ
নির্বাচনী প্রচারণায় বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ তুলেছে এনসিপি, যা দলটির প্রতি কিছু ভোটারের সহানুভূতি তৈরি করছে। তাদের দাবি, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণায় বাধা দেয়া হয়েছে এবং কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এনসিপি প্রার্থী আরিফুল আদিব বলেন, ‘আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে, প্রচারণায় ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকলে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হবে না।’
এলাকার সাধারণ মানুষও সঙ্ঘাত নয়, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করছেন। উত্তরখানের গৃহিণী শামীমা আক্তার বলেন, ‘আমরা শান্তিতে ভোট দিতে চাই। যারা শান্ত পরিবেশ বজায় রেখে আমাদের কাছে আসবে, আমরা তাদেরই সমর্থন দেবো।’
তবে বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। কোনো সহিংসতার সাথে আমরা জড়িত নই।’
পরিবর্তনের ডাক ও আগামীর সমীকরণ
এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিব মনে করেন, ঢাকা-১৮-এর মানুষ এবার গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেবে। তিনি বলেন, ‘পোস্টার আর শোডাউনের রাজনীতি শেষ। আমরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের অঙ্গীকার নিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছি। তরুণ সমাজ পরিবর্তন চায়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকলেও এনসিপি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে নেয়া কৌশলের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা ঐতিহ্যগত শক্তির পক্ষে রায় দেবেন, নাকি ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র ডাকে সাড়া দেবেন- সেই উত্তর মিলবে ভোটের দিন।
এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ঢাকা-১৮-এর মানুষ শুধু উন্নয়নের গল্প নয়, নতুন ধরনের রাজনীতি দেখতে চায়। তার ভাষায়, ‘এই আসনে তরুণ ভোটার অনেক। তারা পুরনো ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে এসে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা চায়।’
তিনি জানান, তার প্রচারণা সীমিত হলেও মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরিই মূল লক্ষ্য। ‘আমরা পোস্টার আর শোডাউনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না; মানুষের কথা শুনতে চাই,’- বলেন তিনি। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই তার প্রধান অঙ্গীকার।
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও দুই প্রার্থীর বক্তব্যে ভিন্নতা স্পষ্ট। আরিফুল আদিব আবারো অভিযোগ করেন, তার প্রচারণায় একাধিকবার বাধা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই তোলা হচ্ছে। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।
মাঠের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি প্রার্থী সাংগঠনিক দিক থেকে এগিয়ে। তার প্রচারণা দৃশ্যমান এবং কর্মীরা সক্রিয়। অপরদিকে এনসিপি প্রার্থী তরুণ ও আদর্শভিত্তিক ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেলেও সংগঠনগত সীমাবদ্ধতা তার বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ঢাকা-১৮-তে রাজনৈতিক উত্তেজনা ততই বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। শেষ পর্যন্ত ফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, মাঠের সংগঠন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের ওপর।



