ভুল বার্তায় পিছিয়ে পড়ল সম্ভাবনার পর্যটন খাত। অনেক প্রত্যাশার পরও বাড়ছে না পর্যটক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ খাতে মন্থর গতির কারণে উদ্বিগ্ন দেশী-বিদেশীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশের পর্যটন খাতের গতিহীনতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন। সংবাদ মাধ্যমটি দেশের পর্যটন ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ করা বিদেশী পর্যটকদের সাথে কথা বলে এর সমস্যা ও সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেছে।
এতে বলা হয়, পর্যটনে অপার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে ভুল বার্তা যাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছে। ইউরোপের দেশগুলো বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ, যানজটপূর্ণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশ মনে করে। এ ছাড়া প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো বিকাশ পায়নি বাংলাদেশের পর্যটন খাত। তবুও বাংলাদেশে আসা বিদেশীরা শুনিয়েছেন দেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনার কথা।
অধিকাংশের মতামত, বিশ্ব মিডিয়ায় ভুল ফ্রেমিংয়ের শিকার বাংলাদেশ। বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশই বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ, যানজটে পরিপূর্ণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভূখণ্ড হিসেবে মনে করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের পর্যটন অবকাঠামো শুধু শহরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তবে নগরের বাইরেও, প্রকৃতি তার দুই হাত ভরে দিয়েছে গ্রামীণ অঞ্চলগুলোকে। অনেক পর্যটকই চায় গ্রামের শিশির ভেজা মাঠ কিংবা জমির আইল ধরে হেঁটে যেতে, নদীর পাড়ে কিংবা গাছের ছায়ায় বসে সময় কাটাতে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকাগুলোতে নেই কোনো মানসম্মত হোটেল। নেই যোগাযোগ অবকাঠামোর সুব্যবস্থা।
এ ছাড়া ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশকে লেভেল ৩ তে স্থান দিয়েছে। নিজ দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাজ্য সরকার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিকদের সতর্ক করেছে। তবুও যারা বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন তাদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে সিএনএন। সবার বর্ণনাতেই উঠে এসেছে বাংলাদেশ সফরের সুখস্মৃতি। পর্যটন খাতের বিকাশে নানা পরামর্শও দিয়েছে তারা।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে বিদেশী পর্যটক এসেছেন ৬ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচক’ অনুযায়ী, বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। গত দুই আড়াই বছরে পর্যটন উন্নয়ন সূচকে ইতিবাচক কোনো সুখবর নেই। উলটো সমন্বয়হীনতা, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের সাথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অস্থিরতা পর্যটন খাতের দ্রুত বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যানকেন্দ্রিক পর্যটন অর্থনীতির বড় স্বপ্ন যেমন অধরা থেকে যাচ্ছে, তেমনি বিদেশী পর্যটক আকর্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, অপূর্ব ভূবৈচিত্র্যের পার্বত্য অঞ্চল, বিস্ময়কর প্রতœতাত্ত্বিক নির্দশন আর বিচিত্র ধর্ম-বর্ণের মানুষের বৈচিত্র্যময়তা বাংলাদেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে দশকের পর দশক ধরে নানা পরিকল্পনা আর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও কোনোভাবে তা গতি পায়নি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসে দেশের পর্যটন খাতে মাস্টারপ্ল্যান বা পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়, সেখানেও দেখা দেয় কচ্ছপগতি। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো যাদের পর্যটন সম্পদ সীমিত, সেসব দেশও পর্যটন অর্থনীতিতে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের পর্যটন খাত অদৃশ্য এক শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে আছে। সমন্বয়হীনতায় এমনিতেই পর্যটন খাতের মহাপরিকল্পনা শুরু থেকেই গতি পাচ্ছে না তার ওপর গত কয়েক বছর ধরে পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা আর সুরক্ষা নিয়ে গভীর সঙ্কট তৈরি হয়েছে। মাঝে মধ্যেই পর্যটকেরা হয় হামলার শিকার হচ্ছেন, নয়তো পরিবার-পরিজন নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। এতে দেশী পর্যটকদের মধ্যে পর্যটন খাতে সেবা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।



