বিশেষ সংবাদদাতা
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতায় আস্থা রাখছেন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। কিন্তু সরকার ও দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে সেই আস্থার প্রতিফলন নেই। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের জনমত জরিপে এমনই এক দ্বৈত বাস্তবতা সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ, অথচ দেশ সঠিক পথে চলছে বলে মনে করেন মাত্র ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড ও দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি সেই আস্থাকে পুরোপুরি ধরে রাখতে পারেনি। ডপলার ওপিনিয়ন রিসার্চের ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’-এ উঠে এসেছে এ চিত্র। আর মানুষের উদ্বেগের জায়গাটিও স্পষ্ট। খাদ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো জনজীবনের সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে আছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও নিত্যপণ্যে মূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ বোর্ড অডিটোরিয়ামে গতকাল এই জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন ইয়ামিন শাফি। বক্তব্য রাখেন, বিডা ও বেজা নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক আসিফ শাহান, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার তুষার, ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: রুবাইয়াত সরওয়ার প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬.৩ শতাংশ
ডপলার জরিপে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন। বিপরীতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, তিনি ভালো করছেন না। আর ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মতামত দেননি। বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়-বিভিন্ন শ্রেণীতে প্রধানমন্ত্রীর কাজের মূল্যায়নে সন্তুষ্টির হার ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে। আটটি বিভাগের প্রতিটিতেই সন্তুষ্টির হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ বা তার বেশি। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের মূল্যায়ন একই মাত্রায় ইতিবাচক নয়।
সরকারকে ভালো বলেছেন ৫৪.৫ শতাংশ
জরিপ ফলাফলে সরকারের সামগ্রিক কাজকে ভালো বলেছেন ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। অন্য দিকে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বলেছেন সরকারের কাজ খারাপ। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের মূল্যায়নের এই ব্যবধানই জরিপের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বার্তা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টি ৬৬.৩ শতাংশ হলেও সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি ৫৪.৫ শতাংশ ব্যবধান ১১.৮ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ নেতৃত্বের প্রতি আস্থার তুলনায় সরকারের কার্যক্রমের প্রতি সন্তুষ্টি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সবচেয়ে বড় চাপ অর্থনীতিতে
মানুষের উদ্বেগের জায়গাটিও স্পষ্ট। খাদ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো জনজীবনের সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে আছে। উন্মুক্ত প্রশ্নে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে এবং ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে দেশের বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বস্তিই এখন সরকারের জনসমর্থন ধরে রাখার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও নিত্যপণ্যে ক্ষোভ
সরকারের বিভিন্ন খাতের কাজের মূল্যায়নেও অর্থনীতির চাপ স্পষ্ট। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেতিবাচক মত দিয়েছেন ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মূল্যায়ন ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ।
দেশ সঠিক পথে বলছেন ৪৮.৬ শতাংশ
প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্টির হার ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও দেশ সঠিক পথে আছে বলে মনে করেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্য দিকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে চলছে। ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি। এখানেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সঙ্কেত। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থাশীল মানুষের একটি বড় অংশ দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে এখনো নিশ্চিত নন।
অতীত নিয়ে হতাশা, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা
পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার প্রশ্নে মানুষ অতীতের তুলনায় বেশি হতাশ। ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে। মাত্র ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আগামী ১২ মাস নিয়ে প্রত্যাশা তুলনামূলক ইতিবাচক। ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ আশা করছেন পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
ফ্যামিলি কার্ডে বড় সমর্থন
সরকারের নির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগে জনসমর্থনের হার আরো বেশি। ফ্যামিলি কার্ডকে সমর্থন করেছেন ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ। করনীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ১ শতাংশ। গণভোটের ফল বাস্তবায়নকেও সমর্থন করেছেন ৭০ শতাংশ। এখানে সরকারের জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা রয়েছে- সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এবং বাস্তব সুবিধা দিতে পারে এমন উদ্যোগ দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
রাজনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর কাজের মূল্যায়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্ট। জাতীয় নাগরিক পার্টির সমর্থকদের মধ্যে এই হার ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্য দিকে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও জনমতের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাজকে ভালো বলেছেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়কের কাজকে ভালো বলেছেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে এসব নেতার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানাশোনার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে ফলাফল বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে।
১০ হাজার ৪১৩ জনের প্যানেল থেকে জরিপ
ডপলার ওপিনিয়ন রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত ‘ইনোভেশনস পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভের (পেপস)’ দ্বিতীয় রাউন্ডের ১০ হাজার ৪১৩ জনের প্যানেল থেকে কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড টেলিফোন ইন্টারভিউ পদ্ধতিতে বর্তমান জরিপ পরিচালনা করা হয়। সরকারের ১৮০ দিনের কাজ নিয়ে জনমত যাচাইয়ে ১০ হাজার ৪১০ জনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। সাড়া পাওয়ার হার ছিল ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। সবমিলিয়ে তিন হাজার ৪৪০ জন উত্তরদাতা জরিপের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তারা দেশের ৬৪ জেলা, ৪৮৪ ওয়ার্ড ও গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২২ সালের আদমশুমারির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফলাফলে ওজন প্রয়োগ করা হয়েছে।
সামনে সরকারের জন্য তিন বড় পরীক্ষা
জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে সরকারের সামনে অন্তত তিনটি বড় পরীক্ষার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। খাদ্য, নিত্যপণ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নিয়ে মানুষের অসন্তোষ কমাতে না পারলে সরকারের প্রতি সামগ্রিক সন্তুষ্টির হার ধরে রাখা কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আস্থাকে সরকারের কার্যকর পারফরম্যান্সে রূপ দেয়া। কারণ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্টির হার সরকারের তুলনায় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তৃতীয়ত, দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে মানুষের আস্থা বাড়ানো। বর্তমানে অর্ধেকেরও কম মানুষ দেশকে সঠিক পথে আছে বলে মনে করছেন। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সেবায় দৃশ্যমান উন্নতি জনমতের এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



