দেড় বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান, কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং দীর্ঘ সংস্কার বিতর্কের পর অবশেষে ব্যালট বাক্সে ফিরে গেল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে পতন ঘটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের; এর পর অন্তর্বর্তী শাসন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হলো বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন।
দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ লাইন- তবে সেই লাইনে ছিল হতাশা নয়, বরং বহুদিন পর ভোট দেয়ার বাস্তব আশাবাদ।
৩২ বছর বয়সী তানভীর মহিউদ্দিন ২০১২ সাল থেকে ভোটার, কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪- কোনো নির্বাচনেই ভোট দেননি। ‘সাজানো নির্বাচনে ভোট দিয়ে কী হবে?’- এমনটাই ভাবতেন তিনি।
কিন্তু এবার প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। ‘কেন্দ্রটা স্বচ্ছ ছিল, নিরাপত্তা ছিল, আর মনে হয়েছে- আমার ভোটটা সত্যিই গণনা হবে,’ বললেন তিনি।
দিনশেষে ফলাফল জানাল বড় ধরনের পালাবদলের কথা।
বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন এবং জোটসহ ২১২টি আসন জিতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। প্রায় দুই দশক পর দলটি আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।
অন্য দিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে- যা বাংলাদেশের সংসদ রাজনীতিতে ইসলামী ধারার প্রত্যাবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পক্ষে ৬৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। অর্থাৎ সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনসমর্থন সুস্পষ্ট।
নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতার নতুন মানদণ্ড
দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য পরিচিত বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচন ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ১২৭ মিলিয়নের বেশি ভোটার ও প্রায় ৫০টি দল অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে ‘বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ মিশন জানায়, নির্বাচন ছিল ‘পেশাদারভাবে পরিচালিত’ এবং ভবিষ্যতের জন্য ‘নতুন মানদণ্ড’।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষক মির্জা এম হাসান বলেন, ‘আমরা অনেকে সহিংসতার আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে- এটাই বড় অর্জন।’
দীর্ঘ সঙ্কটের পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন- এটাই গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
বিএনপির প্রত্যাবর্তন, কিন্তু সহজ পথ নয়
দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সংসদে প্রবেশ করছে বিএনপি। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের সাংবিধানিক সংশোধনসহ বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দেয়।
কিন্তু একই সাথে এই শক্তি ঝুঁকিও তৈরি করে।
কারণ, সংসদে এখন প্রধান বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগ নয়, বরং জামায়াত। অতীতে বিএনপি নিজেকে মধ্যপন্থী রক্ষণশীল দল হিসেবে উপস্থাপন করলেও এখন তাদের ডান দিকে আরো আদর্শিক ইসলামী শক্তি দাঁড়িয়ে গেছে।
ফলে নারী অধিকার, শিক্ষা সংস্কার, সাংস্কৃতিক নীতি বা শ্রম অধিকার- এসব ইস্যুতে সংসদীয় বিতর্ক আরো তীব্র হতে পারে।
হাসানের ভাষায়, ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রের জন্য কখনো কখনো বিপজ্জনক। অতীতে আমরা দেখেছি- এ ধরনের ম্যান্ডেট অপব্যবহার হয়েছে।’
এই প্রেক্ষাপটে দলটির নেতৃত্বে থাকা তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা- ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করবেন, নাকি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করবেন?
গণভোট ও সাংবিধানিক রূপান্তরের সূচনা
জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টির জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- উচ্চকক্ষ গঠন; আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা; তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি।
নতুন সংসদকে অস্থায়ীভাবে আইনসভা ও সংবিধান পরিষদ- দুই ভূমিকাতেই কাজ করতে হবে। তবে এখানেই রাজনৈতিক জটিলতা।
বিএনপি এমপিরা সংসদের শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, আইনি কাঠামোর অস্পষ্টতার যুক্তিতে। বিপরীতে জামায়াত জোটের সদস্যরা দুই শপথই নিয়েছেন। এতে সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপির আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনীতি : সবচেয়ে কঠিন লড়াই
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, ‘অর্থনীতি অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় আছে- উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান কম।’
ব্যাংক খাত সংস্কার, করব্যবস্থা পুনর্গঠন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ- এসব দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে জনসমর্থন দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। তার ভাষায়, ‘মানুষ দুই বছর অপেক্ষা করবে না- ছয় মাসের মধ্যেই ফল দেখতে চাইবে।’
সামনে কোন বাংলাদেশ?
এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। প্রথমবারের মতো একটি গ্রহণযোগ্য ভোট, সংস্কারের পক্ষে জনমত এবং শক্তিশালী সংসদ- সবই ইতিবাচক।
তবে ঝুঁকিও স্পষ্ট- অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ; আদর্শিক মেরুকরণ; সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি; অর্থনৈতিক চাপ এবং আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার ওপর।
ভোট শেষ হয়েছে। ম্যান্ডেট দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই ম্যান্ডেট কি সত্যিকারের গণতন্ত্র গড়বে, নাকি আবারো ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহার দেখবে দেশ- তার উত্তর এখনো লেখা হয়নি।
বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ। তার ভবিষ্যৎ- এখনো নির্মাণাধীন।



