অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাস কেমন ছিল পুঁজিবাজার

Printed Edition
অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাস কেমন ছিল পুঁজিবাজার
অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাস কেমন ছিল পুঁজিবাজার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি সপ্তাহেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সবার প্রত্যাশা নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের আস্থায় রেখে নতুন লক্ষ্যের পানে এগিয়ে যাবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে কেমন ছিল পুঁজিবাজার? কেমন ছিলেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের অংশ হিসেবে অর্থনীতির প্রাণ পুঁজিবাজারও সরকারের সংস্কারের আওতার বাইরে ছিল না। ওই বছরের ১৮ আগস্ট পুনর্গঠিত হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুনর্গঠিত হয় দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পর্ষদ।

কমিশন দায়িত্ব নেয়ার প্রথম চ্যালেঞ্জই ছিল পুঁজিবাজারের সংস্কার। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পার করা পুঁজিবাজারের সব স্তরে যেন অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে খোদ পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ সব প্রতিষ্ঠানই এক প্রকার অনৈতিক আখড়ায় পরিণত হয়েছিল যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে লুটপাট চলছিল। এমনকি খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থায়ও তৈরি হয়েছিল একটি সিন্ডিকেট যারা কোম্পানির তালিকাভুক্তির অনুমোদনসহ নানা প্রক্রিয়ায় নিজেদের পকেট ভারী করায় ছিল লিপ্ত। তাই সংস্কারের শুরুতেই কমিশনকে ওই সিন্ডিকেটের মোকাবেলা করতে হয়। এটা করতে গিয়েই বেশ কয়েক দিন অচলাবস্থায় পার করতে হয় কমিশনকে। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপের কারণে কমিশন কার্যকারিতা ফিরে পায়। কমিশনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করতে হয়।

এ দিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজারের পর্ষদ পুনর্গঠনের সময়ও যথারীতি চলেছে পুঁজিবাজার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলন ক্রমান্বয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। আগস্ট মাসের শুরু থেকেই তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। সে সময় চরম অস্থিরতার মধ্যেও দেশের পুঁজিবাজারগুলোতে যথারীতি লেনদেন চলে আসছিল। ৫ আগস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার সেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে। ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

পরদিন থেকে পুঁজিবাজার পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ৪ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচকটি অবস্থান করছিল পাঁচ হাজার ২২৯ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। আর লেনদেন নিষ্পত্তি হয় ২০৭ কোটি টাকার। ৫ আগস্ট ডিএসইতে লেনদেনের কোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৬ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচকটি প্রায় ২০০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৪২৬ দশমিক ৪২ পয়েন্টে। ওই দিন ডিএসইর লেনদেন চার শ’ কোটির বেশি বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছে যায় ৭৪৯ কোটি টাকায়। ৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার তা এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে। দুই দিনের ব্যবধানে সূচকটির উন্নতি ঘটে ৫০০ পয়েন্ট। পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৯২৪ দশমিক ৮১ পয়েন্টে।

১১ আগস্ট রোববার নতুন সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর লেনদেনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ওই দিন দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটির লেনদেন সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দুই হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে। একই দিন সূচকটিও একই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান ছয় হাজার ১৫ দশমিক ১৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়। তবে পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পুনর্গঠন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সময় কমতে শুরু করে পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেন।

পুনর্গঠিত বিএসইসি নিয়ে প্রথম দিকে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয় আস্থার সঙ্কট। এতে ধীরে ধীরে লেনদেন ও সূচকের অবনতি ঘটতে থাকে। এ দিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অব্যবস্থাপনার চিত্র উন্মোচিত হতে শুরু করলে পুঁজিবাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। ফের নেতিবাচক আচরণ শুরু করে বাজার। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ মে ২০২৫ ডিএসইর লেনদেন নেমে আসে ২২৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ৯ মাসের মাথায় ডিএসইর লেনদেন কমে যায় প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

ইতোমধ্যে নতুন কমিশন সংস্কারকে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। পুঁজিাবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার ও বিশ^বিদ্যালয়ের এ সম্পর্কিত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হয় পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটি, যারা পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আইন ও বিধি সংশোধনে সুপারিশ করবে। কমিশন প্রথম দিকে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয় যেগুলো পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী ছিল। এগুলো ছিল আইপিও বিধিমালা, মার্জিন রুলস বিধিমালা ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা। এ সময় কমিশন একের পর এক স্টেকহোল্ডারদের সাথে বৈঠক করে। পরবর্তীতে কমিশন সংস্কার কমিটির সুপারিশের আলোকে তিনটি ক্ষেত্রেই সংশোধিত খসড়া বিধিমালা তৈরি করে তা জনমত জরিপের জন্য প্রকাশ করে। জনমত জরিপ শেষ করে কমিশন বিধিমালা চূড়ান্ত করে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কমিশনের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসাবে গ্রহণ করে সংশোধিত বিধিমালাগুলোকে স্বাগত জানায়।

তবে বিধিমালা সংশোধনের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করার পাশাপািশ ব্যাংকগুলোর মূলধন শূন্য ঘোষণা করলে আবার অস্থির আচরণ শুরু করে পুঁজিবাজার। পরবর্তীতে ৯টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণায় তা আরো চরম আকার ধারণ করে। এক মাসেরও অধিক সময় এ অস্থিরতা চলার পর চলতি বছরের শুরু থেকে আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে পুঁজিবাজার। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছিল বাজার পরিস্থিতি ততই উন্নতির দিকে যাচ্ছিল। আর এভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে পুঁজিবাজার যেমন গতি ফিরে পেয়েেিছল শেষটাও খুব বেশি খারাপ ছিল না। গত বুধবার নির্বাচন পূর্ববর্তী সর্বশেষ কর্মদিবসে ডিএসইর লেনদেন পৌঁছে যায় ৭৯০ কোটি টাকায়। একই দিন প্রধান সূচকটি আবার পাঁচ হাজার ৪০০ পয়েন্ট স্পর্শ করে। ..