হরমুজ খুলতে শর্তের তালিকা প্রস্তুত করছে ইরান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মধ্যস্থতাকারীরা হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিষয়ে ইরানের শর্ত জানতে চাওয়ার পর তেহরান এখন সেই অনুযায়ী শর্তের তালিকা তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই। তিনি আরো জানান, আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসান ঘটানোও এই শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম। খবর আলজাজিরার।

রেজাই বলেন, হরমুজ দিয়ে একটি শিপিং করিডোর (জাহাজ চলাচলের পথ) তৈরির বিষয়ে ওমানের সাথে ইরান একমত হয়েছে। এই পথের কিছু অংশ ওমানের জলসীমায় এবং কিছু অংশ ইরানের জলসীমায় থাকবে। লেবাননের হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ আল মানার টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দোভাষীর মাধ্যমে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শর্তগুলো মেনে নেয়, তবে জাহাজগুলো একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে।

রেজাইয়ের এই বক্তব্য এমন সময় এলো যখন কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে আলোচনা চালাচ্ছেন। চলমান সঙ্ঘাত প্রশমন এবং হরমুজ খুলে দেয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পথ সৃষ্টি করতে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের জোর তৎপরতার অংশ হিসেবেই এই আলোচনা চলছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার খবর অনুসারে, রেজাই বলেছেন, ‘ইরানের শর্ত পূরণে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; এরপরই ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।’

তিনি তেহরানের আগের হুঁশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ওয়াশিংটন যদি কোনো ধরনের ‘অপতৎপরতা শুরু করে’, তবে ইরান তাদের ‘সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে’। বুধবার একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানায়, ইরান ও ওমান নৌপথ বিষয়ক চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে এখনো কাজ করছে। এর আগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) বলেছিল, প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও এর রাজস্ব কিভাবে ভাগাভাগি করা হবে, সে বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

আইআরজিসির একজন মুখপাত্র বলেন, ওয়াশিংটন যতক্ষণ ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে ‘অবরোধ’ প্রত্যাহার না করছে এবং ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ ইরান প্রণালীটি খুলতে দেবে না। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। এর পর থেকে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকাংশেই বন্ধ রয়েছে। এপ্রিল ও জুনে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক যান চলাচল স্বাভাবিক করা, তবে তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব

এ দিকে ইরান যদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করে দেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ নিশ্চিত করে, তবে দেশটির ওপর থেকে সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং সদ্যঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শীর্ষ এক সূত্রের বরাতে চ্যানেল আল আরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে একথা জানানো হয়। সংবাদমাধ্যমটির খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরান সফরকালে ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাবটি ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। সফরকালে আসিম মুনির ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাইয়ের সাথে এক বৈঠকে অংশ নেন। ওই বৈঠকের আলোচনাকে ‘স্পষ্ট ও নির্ণায়ক’ বলে অভিহিত করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলটি।

এই নতুন প্রস্তাবটিকে চলতি বছরের জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) উপাদানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি পৃথক কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ওই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের বৈরিতা অবসান এবং আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল শর্ত হলো- বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে তেহরানকে। একই সাথে ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। এর বিনিময়ে, যুক্তরাষ্ট্র গত ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধের অভিযান স্থগিত বা বাতিল করবে, ইরানের ওপর থেকে যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং ইরানি সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থেকে চলমান নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব দিলেও ইরান তার মূল দাবিগুলো থেকে সরে আসেনি। তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার, আটকে থাকা ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, নৌ-অবরোধ তুলে নেয়া, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে সার্বিক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের দাবিতে অনড় রয়েছে তেহরান।

উল্লেখ্য, গত ২৪ আগস্ট মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর এক সেকেন্ডারি-নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির উন্মোচন করেন। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, এভিয়েশন ও শিপিং খাতের মতো অবশিষ্ট অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোকে স্তব্ধ করে দেয়া।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ গড়িয়েছে ছয় মাসে। সামরিক উপায়ে কাবু করতে না পেরে ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কার জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরানও এক প্রকার অবরুদ্ধ করে রাখে বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে। এই প্রেক্ষাপটেই, বিশ্ব থেকে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করে ফেলতে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। যেখানে ইরানের সাথে লেনদেন করা যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকেও এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন এই নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা তুলে ধরার সময় বেসেন্ট জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমরা ইরানকে ‘কন্টেইনমেন্ট’ বা আটকানোর চেষ্টা করেছি। সেই নীতি থেকে সরে আসা হচ্ছে। এবার তেহরানের সামনে দু’টি পথ খোলা থাকবে, হয় বৈশ্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, নয়তো স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফেরা। এর মধ্যে যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে বাধ্য করতেই এই নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি।

পাকিস্তানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই নতুন কূটনৈতিক প্রয়াসটি এমন এক সময়ে এলো যখন দু’দেশের আলোচনা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এর আগে জুনে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার মাধ্যমে মার্কিন নৌ-অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়, এ সময় হরমুজ প্রণালীও আংশিকভাবে খুলে দেয় তেহরান। কিন্তু উভয়পক্ষ একে-অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সঙ্ঘাতে জড়ালে সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও ফের বাধাগ্রস্ত হয়।

সর্বশেষ এই মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে কিছু জানাননি। তবে রেজাই পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন যে, তেহরান এ বিষয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা চালিয়ে যাবে। এ দিকে পৃথক এক বার্তায় চীনা কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে বেইজিং ইরানের সাথে তার বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক পরিবর্তন করবে না। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালী একটি অতিসংবেদনশীল নৌপথ। এমতাবস্থায়, অবাধ নৌচলাচলের বিষয়ে যেকোনো টেকসই চুক্তি বৈশ্বিক তেলবাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। অন্য দিকে এই দীর্ঘায়িত অচলাবস্থা উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিকে আরো তীব্রতর করার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এবং ইরানের অনমনীয় শর্তাবলির মধ্যে ব্যাপক ব্যবধানই একটি দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর জটিলতাকে তুলে ধরছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনীতি ফেরানো অসম্ভব নয় : ইরান

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আবার চালু করা অসম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তবে এ জন্য ওয়াশিংটনকে একটি বিষয় বুঝতে হবে চাপ প্রয়োগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। গতকাল শুক্রবার ইরানে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আলে সানির সাথে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে এ কথা জানান আরাকচি। তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, চাপ প্রয়োগ কোনো কাজে আসে না।

আরাকচি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে, সম্মানের সাথে কথা বলতে হবে, ইরানের অধিকার স্বীকার করতে হবে এবং নিজেদের দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কাতার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করেন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ। সফরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ির সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফের সংলাপ শুরুর পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে অস্থায়ী যৌথ নৌ চলাচল করিডোর চালু এবং সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে ইরানযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই ছিল প্রথম ইরান সফর।