জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দ্বীপে অভিযোজন প্রকল্প

সাড়ে ৩ বছরেও অধিকাংশ ঘর নির্মাণ শুরু হয়নি

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • ৪১ শতাংশ অর্থ ব্যয়ে বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ
  • জমি অধিগ্রহণ ও ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতায় ধীর বাস্তবায়ন

সঠিক সমীক্ষা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাবে দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় ছোট দ্বীপ ও নদী চরাঞ্চলের অভিযোজন উদ্যোগ প্রকল্পেও ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নে ধীরগতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদের সাড়ে তিন বছর পার হলেও বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। অথচ মাঝপথে প্রকল্প ব্যয় ৩৮ দশমিক ৮১ শতাংশ বা প্রায় ৩০ কোটি ২২ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ৩০০টি জলবায়ু-সহনশীল ঘরের অধিকাংশের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্রেনিং ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের (টিএমসিআই) হালনাগাদ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপযুক্ত জমির অভাব, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ ক্রয়প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। একই কারণে জরুরি উদ্ধারকারী নৌকা (ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স) কেনার কার্যক্রমও শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের কারণে বিশেষ করে উপকূলীয় দ্বীপ ও নদী চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এসব জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।

ব্যয় বেড়েছে ৩০ কোটি টাকার বেশি

ভোলার চরফ্যাশন এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় প্রকল্পটির মূল কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সম্পূর্ণ বৈদেশিক সহায়তায় ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। পরে মেয়াদ অপরিবর্তিত রেখেই প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১০৮ কোটি ৮ লাখ ১৮ হাজার টাকায় পুনঃঅনুমোদন দেয়া হয়।

কী কী কাজ রয়েছে প্রকল্পে

প্রকল্পের আওতায় ৩০০টি জলবায়ু-সহনশীল ঘর, ৫০০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ইউনিট, ১৩২টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, চরফ্যাশনে ১০টি ক্লাস্টার হাউজ ও দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র, গঙ্গাচড়ায় ২৩ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার এবং নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

এ ছাড়া আটটি জলবায়ু ঝুঁকি মানচিত্র প্রণয়ন, ভোলার সাত উপজেলার পাঁচ হাজার ৯১২ জন সিপিপি স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ, সাতটি আশ্রয়কেন্দ্র ও ১০টি ক্লাস্টার হাউজকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে সজ্জিতকরণ, আটটি ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ, সাড়ে ছয় হাজার মানুষের জলবায়ু-সহনশীল জীবিকায়ন, সাত হাজার ৫০০ কৃষকের প্রশিক্ষণ, চারটি সৌরচালিত কোল্ড স্টোরেজ, ছয়টি সৌরচালিত সেচ পাম্প, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং দু’টি অভিযোজন ও উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৪১ দশমিক ০২ শতাংশ, আর বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। অথচ প্রকল্পের মেয়াদের সাড়ে তিন বছর ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ফলে বাকি দেড় বছরে অবশিষ্ট অর্ধেক কাজ শেষ করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অধিকাংশ ঘর নির্মাণ এখনো শুরু হয়নি

প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ জলবায়ু-সহনশীল ৩০০টি ঘর নির্মাণের কাজও সন্তোষজনক গতিতে এগোয়নি। বর্তমানে এ খাতে অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। গঙ্গাচড়ায় ৯৮টি ঘরের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬টির নির্মাণকাজ চলমান। চরফ্যাশনে ৯৭টি ঘরের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। অবশিষ্ট ১১৫টি ঘরের দরপত্র ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাথমিক নকশায় ৯০০টি ঘর সংস্কারের পরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ উপকারভোগীর ঘর সংস্কারযোগ্য অবস্থায়ই নেই। ফলে পরিকল্পনা সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা বাস্তবায়নে আরো বিলম্ব ঘটিয়েছে।

কেন প্রকল্পে ধীরগতি?

টিএমসিআই বলছে, প্রকল্পের প্রথম বছরেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব হওয়ায় কাজ পিছিয়ে যায়। পরে দীর্ঘ ক্রয়প্রক্রিয়া, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ক্লাস্টার হাউজ, অভিযোজন ও উদ্ভাবন কেন্দ্র এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মতো কার্যক্রমেও বিলম্ব হয়। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নদীতীর সংরক্ষণ, সৌরচালিত কোল্ড স্টোরেজ, সেচপাম্প স্থাপন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষিপ্রযুক্তি এবং জীবিকায়ন কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও জীবিকায়ন কার্যক্রম ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এসব কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, ভেটেরিনারি সেবা, সময়মতো উপকরণ সরবরাহ এবং স্থানীয় উপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার আরো জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বাতিল হলো ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স

প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল আটটি ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি উদ্ধারকারী নৌকা সংগ্রহ। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে দরপত্র আহ্বান করা হলেও নির্ধারিত সময়ে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় প্রকল্প-পরবর্তী সময়ে এর অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরে সরকারের ব্যয়সঙ্কোচন নীতি এবং যানবাহন ক্রয়ে বিধিনিষেধের কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় পুনরায় দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেয়নি। ফলে ভাসমান অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যায়।

টিএমসিআইয়ের পর্যবেক্ষণ

টিএমসিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি অধিগ্রহণ, ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে জলবায়ু-সহনশীল ঘর, ক্লাস্টার হাউজ, অভিযোজন কেন্দ্র এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালনা কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) নিয়মিত সভা না হওয়া এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তিতে ধীরগতিকেও প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিশ্চিত করতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, বিকল্প অর্থায়নের উৎস, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প-পরবর্তী এক্সিট স্ট্র্যাটেজি আরো বাস্তবসম্মত ও শক্তিশালী করা জরুরি।