মো: শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত অধ্যায়ের একটি আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে পুরনো ব্যবস্থার সর্বশেষ বড় প্রতীকটির অবসান ঘটল, যা দেশের আগামী দিনের রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রায় নিয়ে যাবে। এ দিকে চুপ্পুর পদত্যাগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা বিদ্যমান। বিভিন্ন মহল থেকে পদত্যাগের কারণ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি একান্তই তার নিজস্ব সাংবিধানিক ও ব্যক্তিগত অধিকার। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বা রাজনীতির সম্পর্ক নেই।
নানা জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে শুক্রবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন মো: সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগপত্রে শারীরিক ও মানসিক কারণ দেখানো হলেও নেপথ্যে নানা বিষয় জড়িত বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। ৫ আগস্টের পরপরই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি না মানা, শীর্ষ আমলা-পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন করা হলেও শুধু সাহাবুদ্দিনকে বহাল রাখার ক্ষেত্রে বিএনপির অমতকে দায়ী করে আসছেন সরকারের বাইরের দল ও অন্যরা। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই রাষ্ট্রপতির অপসারণের ক্ষেত্রেও প্রধান বাধা ছিল বিএনপি। আবার সরকার গঠনের পর গত পাঁচ মাসে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি দলটি। বরং রাষ্ট্রের সব জায়গায় তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সম্মান দিয়েছেন সরকারপ্রধান। তবে সম্প্রতি গুঞ্জন ওঠে, চিকিৎসার জন্য গত ৯ মে লন্ডন সফরে গিয়ে সদ্য সাবেক হওয়া রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন টেলিফোনে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছেন। এরপরই তার পদত্যাগের বিষয়টি জোরেশোরে সামনে আসে।
তবে এরইমধ্যে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণ নিয়ে অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির অভিপ্রায়কে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই বলছেন, এত দিন সরকার গঠন ও শপথগ্রহণসহ সাংবিধানিক কিছু কার্যক্রমের জন্য রাষ্ট্রপতিকে তার পদে বহাল রেখেছে বিএনপি। হয়তো এ মুহূর্তে তার প্রতি কোনো আস্থা রাখতে পারছেন না দলটির হাইকমান্ড। তাই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়ে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, আসলে রাষ্ট্রপতির তো নির্বাহী কোনো ক্ষমতা নেই। তাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের রাজনৈতিক কোনো তাৎপর্য নেই। তিনি অসুস্থতায় পদত্যাগ করতেই পারেন, আবার সরকারের তরফে কোনো নির্দেশনাও থাকতে পারে।
সূত্র মতে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি জানিয়ে রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। একই দাবিতে মিছিল সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ সমমনা দলগুলো। এমনকি বঙ্গভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। যদিও তখন বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো সায় পাওয়া যায়নি। তাই তার পদত্যাগে পদক্ষেপ নেয়নি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এমন কথাও প্রচলিত আছে। এ ছাড়া বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় ঈদগাহেও একসাথে নামাজ পড়েন ও কোলাকুলি করেন দুইজন। এ সময়ে সরকারের বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেননি রাষ্ট্রপতি। বরং অনেক সময় শেখ হাসিনা সরকারের বিপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও সাহাবুদ্দিনকে সরানোর দাবি জানানো হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনে তার ভাষণের সময় বিরোধীদলীয় সদস্যরা প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট করেন। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ ও গ্রেফতারের দাবি জানান। নাহিদের অভিযোগ ছিল, সাহাবুদ্দিন শপথ ভঙ্গ করেছেন, তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি নির্বিকার ছিলেন। তাই ধরে নেয়া হয়েছিল, তাকে এত সহজে সরাবে না সরকার।
তারপরও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে কেন বিদায় নিতে হলো? কেউ বলেন, সরকার সবক্ষেত্রে নিজেদের লোক বসাতে চায়। আবার অনেকের ধারণা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণায় সরকারের মধ্যে উদ্বেগ থাকতে পারে। তখন সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকলে ভিন্ন রকম পরিস্থিতি হতে পারে। এ কারণে তাকে পদত্যাগ করানো হতে পারে।
জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না নয়া দিগন্তকে বলেন, এত দিন রাষ্ট্রপতিকে সহ্য করা হলো, কিন্তু ‘দুই দিন’ সহ্য করা গেলো না! জরুরি ভিত্তিতে স্পিকারকে দেশে ডেকে আনতে হলো। সরকার হয়তো চেয়েছে, তাই তিনি পদত্যাগ করেছেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বিএনপির প্রত্যাশা অনুযায়ীই ভূমিকা রেখেছেন মো: সাহাবুদ্দিন। নিজের জায়গা থেকে তার তেমন কিছু করা সম্ভব ছিল না। তাই পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়। তারপরও বলব, বিএনপির অভিপ্রায়েই এ ঘটনা ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহছানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিটি মানুষের প্রাণের দাবি ছিল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ। তাই তার পদত্যাগে আমরা দলগতভাবে খুশি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে সরকারের কাছে দাবি জানানো হলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ দিকে তার পদত্যাগের পেছনে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে আসা নানা অভিযোগগুলোও কাজ করেছে বলে জানা গেছে। সূত্রটি বলছে, সাহাবুদ্দিন দুদকের কমিশনার থাকার সময় বেসিক ব্যাংকের আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত নিয়েও সংস্থাটি প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। রাষ্ট্রপতি পদে তার আইনগত যোগ্যতা নিয়েও আদালত পর্যন্ত বিতর্ক গড়ায়। এ ছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে দুদকের তদন্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুদক মামলাটি আবার অনুসন্ধান শুরু করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও কমিশনার মো: সাহাবুদ্দিন তদন্তটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন। তবে এ অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত নয়। দুদকের দায়িত্ব ছাড়ার পর সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের প্রভাব ও বিপুল অর্থ বের করে নেয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে সাহাবুদ্দিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে থাকায় তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার ভূমিকা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নতুন করে তাকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় জটিল সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে ক্ষমতাসীন দলগুলো রাষ্ট্রপতির ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করার পথই বেছে নিয়েছে। ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের ঘটনা এর বড় উদাহরণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে না যাওয়ার অভিযোগে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও অভিশংসনের পরোক্ষ হুমকিতে তাকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে অভিশংসনের কাঠামোগত পথে না হেঁটে রাজনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে পদত্যাগের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করার কৌশলটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান বলে অনেকেই মনে করছেন।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই কেন রাষ্ট্রপতিকে সরানোর পদক্ষেপ নিতে কালক্ষেপণ করা হলো? কেন এত মাস সময় নেয়া হলো? এর জবাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, যেকোনো নতুন বা পুনর্গঠিত সরকার ক্ষমতায় এসেই সব পুরনো কাঠামো একসাথে ভাঙতে চায় না। প্রথমে আইনগত ও প্রশাসনিক অবস্থান শক্ত করা হয়, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং বিরোধী পক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। রাষ্ট্রপতির পদটি সংবিধান অনুযায়ী খুবই সীমিত ক্ষমতার যেখানে প্রতিটি কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে পরিচালিত হয়। ফলে এই চেয়ারে কে বসে আছেন, তা সাধারণ পরিস্থিতিতে সরকারের দৈনন্দিন পরিচালনায় খুব বড় বাধা সৃষ্টি করে না। বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা মূলত সঠিক সময় ও অনুকূল রাজনৈতিক আবহের জন্য অপেক্ষা করছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, রাজনীতিতে কোনো সিদ্ধান্তই আকস্মিক নয় বরং তা সুদূরপ্রসারী কৌশলেরই ফল। অভ্যুত্থান পরবর্তী সংকটময় মুহূর্তে শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা এড়ানো এবং নতুন অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার বৈধতা দেয়ার প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির পদটির একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবহারিক মূল্য ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যখন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নিজেদের ভিত্তি মজবুত করেছে, তখন বিদায়ী ব্যবস্থার স্মারক হিসেবে থাকা এই বিতর্কিত রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায়, গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ায় পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশকে ধাপে ধাপে অপসারণ করা একটি স্বাভাবিক ঘটনা।
এ দিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের পেছনে নানান সমীকরণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তাকে অসুস্থতার অজুহাতে হয়তো সরে যেতে বলেছেন। কারণ তার সাথে একটি ফোনালাপের বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এ ছাড়া এতদিন সরকার তাকে কিছুটা বিশ^াস করলেও এখন আর আস্থায় রাখতে পারছেন না। এটি পাশের দেশের প্ল্যানেরও অংশ হতে পারে।
পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা উনার পদত্যাগ পত্রে যা দেখেছি, স্পিকার যা বলেছেন, আপাতত সেটিকে পদত্যাগের কারণ বলতে পারি। এর বাইরে কিছু আছে কি না সেটি সময়ই বলে দিবে। যদিও আমরাসহ অনেক দলই তার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কারণ তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদের দোসর।



