গত ৬ মাসে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ২৬ শতাংশ

সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খুনোখুনি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা কমানো। নতুন সরকারের কাছে স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা ফেরাতে চাঁদাবাজি বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং খুনোখুনি সহিংসতা কমিয়ে দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা আশা করেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি দেখছেন সাধারণ মানুষ।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • ৬ মাসে সারা দেশে খুন ১৭৮৯
  • নারী ও শিশু নির্যাতন ১১ হাজার ১৬৫
  • চুরি ৬ হাজার ৩৯৯, ডাকাতি দস্যুতা ১ হাজার ১৬৯

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যা ছিল তার চেয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেয়ার গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খুনোখুনি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা কমানো। নতুন সরকারের কাছে স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা ফেরাতে চাঁদাবাজি বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং খুনোখুনি সহিংসতা কমিয়ে দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা আশা করেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি দেখছেন সাধারণ মানুষ।

অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সুযোগে উগ্রবাদ, সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা থাকলেও অবনতিই লক্ষ করা গেছে বেশি।

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান ও অন্যান্য সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৪১৯। ওই সময় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৩০৮টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৯ হাজার ৩৬৭টি। অপর দিকে নির্বাচিত সরকারের গত ছয় মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৭৮৯টি। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১৬৯। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১১ হাজার ১৬৫। চুরির ঘটনায় ছয় হাজার ৩৯৯, অপহরণের ঘটনায় ৫১২টি মামলা করা হয়েছে। একই সময়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ আক্রান্তের মামলা করা হয়েছে ৩১৭টি। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের চেয়ে খুনোখুনি বেড়েছে ৩৭০টি। যা শতাংশের হারে দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশ। সরকারের শেষ ছয় মাসে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলার উন্নতির চেয়ে অবনতি বেশি লক্ষ করা গেছে।

নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে খুনোখুনি বন্ধ হয়নি। একের পর এক প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড আলোচনায় আসছে। রাজনৈতিক কোন্দল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায় ঘটছে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানে ও ফুটপাথে চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। পাশাপাশি ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ছিনতাই, চুরি এবং সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধও জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে।

রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, জমি দখল, ব্যবসা ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরোধ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা- সবকিছু মিলেই হত্যার ঘটনাগুলো ঘটছে। এর সাথে নতুন উদ্বেগ হয়ে যুক্ত হয়েছে পেশাদার অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা।

রাজধানীতে গত ছয় মাসে তালিকাভুক্ত অপরাধী ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের লক্ষ্য করে একাধিক সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যার পর পুলিশও প্রাথমিকভাবে অপরাধী চক্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো বড় সঙ্কেত দেয় যে, অপরাধ এখন শুধু সুযোগসন্ধানী নয়- কোথাও কোথাও তা পরিকল্পিত, সংগঠিত এবং অস্ত্রনির্ভর।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধজগতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় বিদেশে থাকা অপরাধীদের একটি অংশও দেশে বা দেশের অপরাধচক্রের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।

সরকার বদলের পর কোথাও পুরনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী দুর্বল হয়েছে। নতুন গোষ্ঠী সেই জায়গা নিতে চেয়েছে। বাজার, পরিবহন, ফুটপাথ, নির্মাণকাজ, বালু ও জমি ব্যবসা, মাদক এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব যখন রাজনৈতিক পরিচয় বা আশ্রয় পায়, তখন সাধারণ অপরাধ দ্রুত সংঘটিত অপরাধে পরিণত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর কারণ বাহিনীগুলোর সক্রিয়তায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।’ তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘মব’ বা সঙ্ঘবদ্ধ জনতার মাধ্যমে কাউকে আক্রমণ, অপদস্থ, দখল বা শাস্তি দেয়ার যে সংস্কৃতি দৃশ্যমান হয়েছিল, তার রেশ এখনো রয়েছে। আইন ভাঙলেও খুব বেশি কিছু হবে না, এমন ধারণা অপরাধীদের একাংশের মধ্যে সাহস তৈরি করেছে।

ড. তৌহিদুল হকের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যের মতো অপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ সক্রিয়তার বিকল্প নেই। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনো অপরাধীর ঢাল হতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো: রেজাউল করিম বলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতায় কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য পেশাদার অপরাধী পর্যন্ত ভাড়া করা হচ্ছে। চাঁদাবাজি ও প্রটেকশন মানির অর্থনীতিও অপরাধকে টিকিয়ে রাখছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত না করলে অপরাধী চক্র আরো সাহসী হবে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গত রোববার নয়া দিগন্তকে বলেন, গত কয়েক বছরে হত্যার হার প্রায় একই ধরনের প্রবণতার মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব কমাতে পুলিশ প্যাট্রলিং, গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ আগের চেয়ে অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আগের চেয়ে আভিযানিক হারও বেড়েছে। অপরাধী যতই বড় অপরাধ করুকনা কেন তারা পার পাচ্ছে না। বিচ্ছিন্ন কিছু রাজনৈতিক কোন্দলে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ এসব ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং অনেক ঘটনায় রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে।