খালিদ সাইফুল্লাহ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে একজন জুলাই শহীদের মা’কে মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজধানীর দক্ষিণখানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা সাবেক স্কুলশিক্ষকা রোকেয়া বেগমকে মনোনয়ন দিচ্ছে দলটি। এ ছাড়া জোটের শরিকদেরও দু’টি আসন ছাড় দিচ্ছে জামায়াত। বিরোধী জোটের প্রাপ্য ১৩টি আসনের বাকি প্রার্থীদের নামও প্রায় চূড়ান্ত। নির্বাচন কমিশন থেকে ইতোমধ্যে তাদের জন্য মনোনয়ন ফরম কেনা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে ১১ দল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৭৭টি আসন পেয়েছে বিরোধী জোট। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুইটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়লাভ করে। জাতীয় সংসদের ৩০০ সাধারণ আসনের বিপরীত সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে ৫০টি। সংখ্যানুপাতিক হারে সরকারি দল বিএনপি জোট ৩৬টি এবং বিরোধী জোট ১৩টি আসন পাচ্ছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা মিলে পাচ্ছেন একটি আসন।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ মে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল এবং বাছাই ২২-২৩ এপ্রিল। প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল এবং প্রতীক বরাদ্দ হবে ৩০ এপ্রিল।
নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করতে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রির পর প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী তালিকা তৈরি করতে দলটির মহিলা বিভাগের পক্ষ থেকে একটি তালিকা মূল দল জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে দেয়া হয়েছে। সেখানে যাচাই বাছাই শেষে প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া জোটগতভাবেও আসন বণ্টন নিয়ে বৈঠক করেছে ১১ দল। জানা যায়, বিরোধী জোটের প্রাপ্য মোট ১৩টি আসনের মধ্যে জামায়াতের ৬৮টি আসনের বিপরীতে ১১টি সংরক্ষিত আসন পাওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে তারা শরিকদের কয়েকটি আসন ছাড় দিচ্ছে। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের জাগপার কোনো প্রার্থী না থাকায় সংরক্ষিত আসনে তাদের একটি আসন দেয়া হচ্ছে। দলটির সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান জামায়াতের মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। এ ছাড়া এনসিপির ছয়টি আসনের বিপরীতে একটি আসন পেলেও তাদের জন্য আরো একটি অতিরিক্ত আসন দেয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মনিরা শারমিন এনসিপির প্রার্থী হচ্ছেন। আর ডা: মাহমুদা মিতু জামায়াতের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হবেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুইটি আসনের সাথে জামায়াতের অতিরিক্ত দু’টি আসন যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একটি আসন পেতে পারে। এ ছাড়া একজন জুলাই শহীদের মা’কে মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। বাকি আটটি আসনে জামায়াতের মহিলা বিভাগের নেত্রীরা এমপি হিসেবে মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, আইন ও মানবাধিকার বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সাবিকুন নাহার মুন্নি, নাজমুন নাহার নিলু, শামসুন নাহার, (চট্টগ্রাম), মাহফুজা সিদ্দিকা (সিলেট), সাজেদা সামাদ (বগুড়া) এবং আলোচিত টকশো ব্যক্তিত্ব ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, প্রার্থীদের নাম প্রায় চূড়ান্ত। আগামী সোমবার তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। ১৩টি আসনের জন্য ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়ন ফরমও তোলা হয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম জানান, আমরা একজন জুলাই শহীদের মাকে জামায়াতের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এজন্য রাজধানীর দক্ষিণখানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহীদ ছয় বছরের শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা সাবেক স্কুলশিক্ষকা রোকেয়া বেগমকে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোমবার ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের দিন। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিন। এ সময় জাবিরের বাবা ও তিন চাচার পরিবারসহ বেলা ২টার দিকে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে বের হন। সাথে ছিল জাবিরও। উত্তরা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তর গেটে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয় জাবির। মা-বাবার সাথে রাজধানীর দক্ষিণখান থানার পশ্চিম মোল্লারটেকে থাকত সে। প্রেম বাগানের কে. সি. মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারিতে পড়ত। দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে জাবির সবার ছোট। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই জাবিরকে প্রথমে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও ওই হাসপাতালে আইসিইউ ছিল না। প্রায় দুই ঘণ্টা পর জাবিরের পরিবার তাকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিলে সেখানের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে তাকে দাফন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয় পরিবার। শেষ পর্যন্ত রাত দেড়টায় তাকে দাফন করা সম্ভব হয়।
জানা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে জামায়াতের চার নারী সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০১-০৬ মেয়াদে সংরক্ষিত আসনে জামায়াত মনোনীত সদস্য ছিলেন, জামালপুরের সুলতানা রাজিয়া, জামায়াতের বর্তমান আমির ডা: শফিকুর রহমানের স্ত্রী ডা: আমিনা বেগম (সিলেট), রাজশাহী থেকে শাহানারা বেগম ও সাতক্ষীরা থেকে বেগম রোকেয়া আনসার। ১৯৯১ সালেও দলটির দুই নারী সংরক্ষিত আসনে সদস্য হয়েছিলেন। বেগম হাফেজা আসমা খাতুন ও বেগম খন্দকার রাশিদা খাতুন এমপি হন তখন। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২০০৯ সালে ১২ জন এবং ২০১৪ সালে জামায়াত মনোনীত ৩৬ জন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।



