নিজস্ব প্রতিবেদক
গতকাল ২৩ জুন ছিল পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে মীর জাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ইংরেজ বেনিয়াদের কাছে পরাজিত হন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সেই সাথে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতা সূর্য। এ উপলক্ষে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে ‘পলাশী দিবস ও আলোচনা সভা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘পলাশী দিবসের তাৎপর্য ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ’।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রায় ২৭০ বছর আগের পলাশীর ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি আজও আমাদের দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পলাশী কেবল ভাগীরথী নদীর তীরেই সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমান বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বুড়িগঙ্গার তীরেও একই ধরনের চক্রান্ত সচল রয়েছে। নব্য সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যবাদের রূপ এখন বদলেছে। এখন তারা সরাসরি ভূখণ্ড দখল করে না, বরং দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতিকে পর্দার আড়াল থেকে নিজেদের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করে। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও মীর জাফর এবং ঘসেটি বেগমদের মতো চরিত্রের অভাব নেই, যারা বিদেশী প্রভুর সেবাদাসত্ব করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দিল্লির আধিপত্যের চরণে সমর্পণ করতে ব্যস্ত।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিলের ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ উক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের মানচিত্র ও পতাকা আলাদা হলেও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আজও অরক্ষিত ও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়- দেশের ভেতরের রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের আদর্শিক দীনতা। ক্ষমতার লোভে এবং নব্য আধিপত্যবাদীদের খুশি করতে দেশের প্রথম সারির দলের জনপ্রতিনিধিরাও সংসদে দাঁড়িয়ে ১৯৪৭ সালের ভূখণ্ডগত সীমানা ও ঐতিহাসিক ভিত্তি তুলে দেয়ার বা অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন।
বিশেষ অতিথির আলোচনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক বেলাল হোসেন বলেন, ১৭৫৭ সালের প্রায় ১৫০ বছর পরে এসে মুসলমানরা একটি রাজনৈতিক সংগঠন পেয়েছে। যে সংগঠনের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের দাবি রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করা যায়। রাষ্ট্র, রাষ্ট্র পরিচালনা, শাসন- এগুলো সামাজিক বিষয় না, এটা রাজনৈতিক বিষয়। রাসূল সা:-এর ইন্তেকালের পর দীর্ঘ প্রায় ১৫০০ বছরে মুসলমানরা সবচেয়ে কষ্টকর, বেদনাদায়ক সময় পার করেছে গত ১০০ বছর। এই পলাশী দিবস বার্তা দেয়, আমরা আমাদের সম্পদ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব হারিয়েছি। আমাদেরকে সেই গৌরব আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। এটা এমনভাবেই তার জায়গা দখল করে নেয় এবং বারবার ঘসেটি বেগম এবং রায় দুর্লভদের আবির্ভাব হয়, যারা এই দেশে খেয়ে, এই দেশে বড় হয়ে, এ দেশের জনগণের অর্থ ব্যবসা-বাণিজ্য করে, আবার এই জনগণের ওপরই তাদের বিরোধী সন্ধি চাপিয়ে দিয়ে জনগণকে শত শত বছরের জন্য বারবার পরাধীন করে রেখেছে। ১৯৪৮-৪৯ সালের এই ২৩ জুন একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছিল- যার নাম আওয়ামী লীগ। তাদের জন্মটাই হয়েছে এই বাংলাদেশকে পরাধীন করে রাখার জন্য এবং যার নজরানা তারা দিয়েছে যখন এদেশের জনগণ পূর্ববর্তী সময়ের মতো তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা যাদের আধিপত্যকে এই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করেছিল, সে আধিপত্যবাদীদের কাছে গিয়েই আবার তারা আশ্রয় নিয়েছে।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী এমপি; বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ড. সায়ীদ ওয়াকিল। এ ছাড়া ছাত্রশিবিরের দফতর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক আনিসুর রহমান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদিব মুসা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ঢাবি শিবিরের আলোচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, দূরদর্শিতার অভাব, প্রজ্ঞার ঘাটতি এবং জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিস্বার্থকে স্থান দেয়ার কারণেই ১৭৫৭ সালে পলাশীতে বিদেশী ষড়যন্ত্রের পথ সুগম হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা। ঐতিহাসিক পলাশী দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ওসমান হাদি হল (প্রস্তাবিত) অডিটোরিয়ামে ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ : সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও আজাদির সংগ্রামের সিলসিলা’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে ঢাবি শাখা ছাত্রশিবির। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের ঢাবি শাখা সেক্রেটারি কাজী আশিক।
সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন। পলাশীর বিপর্যয়ের ঐতিহাসিক কারণ ও প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলার শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের কারণেই ইংরেজরা প্রথমে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এ ভূখণ্ডে আসে।
কিন্তু ১৭৫৭ সালের পলাশীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব হারায়। তবে পরবর্তী এক শতাব্দীজুড়ে তারাই স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।’
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে ড. বিলাল হোসাইন আরো বলেন, ‘১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ প্রথম আজাদি লাভ করে। এরপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা পূরণে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় দ্বিতীয় আজাদি। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালে সংঘটিত হয়েছে সর্বশেষ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। এই দীর্ঘ সংগ্রাম কোনো শক্তিই দমন করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।’
বিশেষ আলোচকের বক্তব্যে গবেষক ও প্রাবন্ধিক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলাই ছিলেন প্রথম শাসক, যিনি ইংরেজদের কর্মকাণ্ডকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে প্রথম চিহ্নিত করেছিলেন।’ ১৬০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্য নির্মাণের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি মুঘল আমলের নৌশক্তির দুর্বলতা এবং ১৭১৩ সালে সম্রাট ফররুখ শিয়রের বিতর্কিত ফরমানের ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীদের ওপর সৃষ্ট বৈষম্যের ইতিহাসও তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
আলোচকরা ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ব্রিটিশরা শুধু দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতাই দখল করেনি, বরং সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তিও দুর্বল করে দিয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ঐতিহ্যবাহী ওয়াকফভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া মসলিন শিল্প ধ্বংস, জোরপূর্বক নীলচাষ এবং ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির মাধ্যমে সমাজে একটি গভীর জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক সঙ্কট তৈরি করা হয়।
আলোচনা শেষে বক্তারা পলাশীর সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী নবাব সিরাজউদ্দৌলাসহ সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। একই সাথে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ছাত্রসমাজকে সজাগ থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।



