রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে ৩৮ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

এখন আশঙ্কার কারণ হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক নেতাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে আগের মতো নিয়োগবাণিজ্য এবং কম যোগ্যতার বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতাও নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। একইসাথে পুরনো যে অভিযোগ ছিল জাল সার্টিফিকেটে শিক্ষকতা করা সেই একই অভিযোগেরও পুনরাবৃত্তিরও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নিকট অতীতে অভিযোগ ছিল ৯৭৩ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের জাল সার্টিফিকেটের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই শিক্ষকদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকতা চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

  • সভাপতিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিল
  • কৌশলে কব্জায় নিচ্ছে বেসরকারি স্কুল কলেজ
  • নিয়োগ বাণিজ্য ও দলীয় প্রভাব বিস্তারের শঙ্কা

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে সরকার। তবে গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার জন্য বিদ্যমান ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতায় স্নাতক পাসের শর্ত বাতিল করা হয়েছে। আগের প্রবিধানমালা সংশোধন করে কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতাও শিথিল করা হয়েছে। এতে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা আগের আওয়ামী সরকারের আমলের মতোই পুরনো নিয়মে ফেরানো হচ্ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যে কেউই এখন স্কুল-কলেজের সভাপতির পদের জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। নতুন নিয়মে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি থেকে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রযোজ্য হচ্ছে না। এখন আশঙ্কার কারণ হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক নেতাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে আগের মতো নিয়োগবাণিজ্য এবং কম যোগ্যতার বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতাও নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। একইসাথে পুরনো যে অভিযোগ ছিল জাল সার্টিফিকেটে শিক্ষকতা করা সেই একই অভিযোগেরও পুনরাবৃত্তিরও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নিকট অতীতে অভিযোগ ছিল ৯৭৩ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের জাল সার্টিফিকেটের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই শিক্ষকদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকতা চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন। সম্প্রতি জাল সার্টিফিকেটধারী চিহ্নিত এই শিক্ষকদের বেতনভাতার সমুদয় টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের বেসরকারি স্কুল কলেজ মাদরাসা এবং বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতায় কোনো প্রকারের শর্ত রাখা হয়নি। তবে শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সভাপতির পদের জন্য ন্যূনতম গ্র্যাজুয়েট হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনে বেশ কিছু নতুন শর্ত আরোপ করা হয়। এর মধ্যে প্রথমেই প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ থাকতে পারবে না মর্মে শর্ত আরোপ করা হয়। বরং সেখানে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদমর্যাদার সরকারি চাকরিজীবীদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়। যদিও তখন থেকেই বিএনপির পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে জোর আপত্তি জানানো হয়। কিছু কিছু জায়গায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশনও দাখিল করা হয়। এসব বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি আদালত।

এর আগে শিক্ষক নেতা ও কুমিল্লা-২ সংসদীয় আসনের নব নির্বাচিত সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আগের মতো রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করেন। সেখানে স্কুল বা কলেজের কমিটি গঠনে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা দেয়ার বিষয়ে দাবিও জানানো হয়। একইসাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতেও দাবি উঠে আসে। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া আরো জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে রাজনৈতিক নেতাদের বহাল রাখতে হবে। এমনকি একজন এমপি যেন অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি থাকতে পারেন সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ রিভিউ সংক্রান্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সভাপতিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। সভায় অংশ নেয়া ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক পাস নিয়ম আর থাকছে না। ফলে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের আগের নিয়ম বহাল থাকবে। অর্থাৎ কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রযোজ্য হবে না।

শিক্ষামন্ত্রণায় সূত্র আরো জানায় সভাপতিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়ে শর্ত শিথিল করা হলেও শিক্ষক নিয়োগ কিংবা অন্যকোনো বিষয়ে আগের মতো স্থানীয় সংসদ সদস্যদের একচ্ছত্র কোনো নিয়ন্ত্রণ আর থাকবে না। কমিটি গঠনের বিষয়ে সংসদ সদস্য সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপও করতে পারবেন না। নতুন এই নিয়মে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগে সংসদ সদস্যের ক্ষমতাও আর থাকছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, ইউএনও, ডিসি, বিভাগীয় কমিশনার হয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানের কাছে তিনজনের নামের তালিকা যাবে। সেখান থেকে একজনকে কমিটির প্রধান বা সভাপতি করবে শিক্ষা বোর্ড।

সূত্র জানায়, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হতো না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ প্রণয়ন করে। ওই প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা বিষয়ে বলা হয়েছিল, এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কোনো ব্যক্তি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।

এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ আগস্ট প্রবিধানমালা সংশোধন করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস নির্ধারণ করে গেজেট জারি করে। সেই নিয়ম বাতিল করে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের আগের নিয়মে ফিরল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতি পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার। এরমধ্যে মাধ্যমিক স্কুল প্রায় ১৮ হাজার, স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রায় দেড় হাজার, কলেজ ৩ হাজার ৩৪১টি, মাদরাসা (দাখিল-কামিল পর্যায়) ৯ হাজার ২৫৯টি এবং কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৩৯৫টি। এসব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়মে এবং নতুন শর্ত মোতাবেক কমিটি গঠন হলে আশঙ্কা করা হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই রাজনৈতিক নেতাদের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তখন শিক্ষার মান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতেও বিশৃঙ্খল একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।