এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতির পেছনে ১৪ কারণ চিহ্নিত

জুলাই মাসে বাস্তবায়ন হার ০.৬৯%

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির পেছনে ১৪টি কারণ চিহ্নিত করেছে সরকার। এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প দলিল, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা। এসব সমস্যা সমাধানে প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মানোন্নয়ন, ই-জিপির ব্যবহার বাড়ানো, প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদারের মতো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর পক্ষে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণগুলো তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।

উল্লেখ্য, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ১ শতাংশের নিচে। গত সোমবার প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

এ দিকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পের ত্রুটিপূর্ণ দলিল প্রণয়ন, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও তথ্যের অসঙ্গতি এডিপি বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে। এর পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বৃদ্ধি, যথাযথ সমাপ্তি পরিকল্পনার (এক্সিট প্ল্যান) অভাব এবং প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বও বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে।

এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে গবেষণালব্ধ ফলাফল যথাযথভাবে কাজে না লাগানো, স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প মনিটরিংয়ের ঘাটতি, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে অসামঞ্জস্য, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা এবং একাধিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে দায়িত্ব বণ্টন ও সমন্বয়ের ঘাটতিকেও ধীরগতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা দেশ থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ডিপিপি বা টিএপিপি প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনে নীতিমালা অনুসরণে ঘাটতিও রয়েছে। পাশাপাশি ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কাঠামোর ঘাটতি এডিপি বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গতি বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে : এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে সরকার প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকল্প প্রস্তুতির মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ই-জিপির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকদের ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তার দায়িত্বে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা সভা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি বাড়ানো হয়েছে। যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেসব প্রকল্পের উপযোগিতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে পুনর্বিন্যাস, প্রকল্পের পরিধি পরিবর্তন অথবা প্রকল্পটি চলমান রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে।

নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও সংশোধনের কারণ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধিঅনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগও রয়েছে বলে সংসদকে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।

এ দিকে বাস্তবায়নে চরম ধীরগতি : চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই সময়েও বাস্তবায়নের হার একই রকম ছিল। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাইয়ে এ হার ছিল ১ দশমিক ০৫ শতাংশ।

গত সোমবার প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ব্যয় করেছে দুই হাজার ১২১ দশমিক ১৮ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল এক হাজার ৬৪৪ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে সরকারি সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নসহ এডিপিতে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।