নিজস্ব প্রতিবেদক
ঘন কুয়াশায় বেড়েছে শীত। সারা দিন দেখা যায়নি সূর্যালোক। কুয়াশার স্তর ভেদ করে যেটুকু আলো দেখা গেছে সেটুকু হয়তো সবার কাজে-কর্মে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি; কিন্তু যান চলাচলে বিঘœ ঘটিয়েছে। বিমান চলাচলে এ ধরনের আবহাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। দিনের বেশির ভাগ সময়ই মৃদু সূর্যালোক থাকায় প্রভাব পড়েছে তাপমাত্রায়। ফলে দেশের একটি অংশে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ চলছে। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছিল যশোরে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ এবং নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও তা অব্যাহত থাকতে পারে। আজ শনিবারও মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং দেশের অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার কুয়াশা পড়তে পারে। ফলে আজও দেশের সার্বিক তাপমাত্রার তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না।
ঘন কুয়াশাজনিত কারণে সৃষ্ট শীতে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ভোর থেকেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় সর্বত্র। ভোরের দিকে কুয়াশার পর্দা এত ঘন ছিল যে, কাছের জিনিসটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। খালি মাথায় হাঁটলে কিছুক্ষণ পর ভিজে যায় চুল। মনে হচ্ছিল বৃষ্টি পড়ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে চাননি অনেকে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা বাইরে বের হতে চাননি। শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিক চাঞ্চল্যতা থাকলেও মা-বাবা তাদের বাইরে বের হতে দেননি।
ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কাছে চলে আসায় রাতের বেলা যানবাহনের গতি কমে যায় দুর্ঘটনা এড়াতে। ঘন ঘন হুইসেল বাজিয়ে যানবাহনকে চলতে হয়। সকাল বেলাও যানবাহনের গতি বাড়েনি। গতি ধীর হয়ে যাওয়ায় রাতে ও সকালে যাত্রা করা যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি দেরি হয়েছে। পানিপথে লঞ্চ, ইঞ্জিনচালিত বোটগুলোর একই অবস্থা। ঘন ঘন হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে চলতে হয়েছে। নদীতে যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে চলাচল। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বিড়ম্বনা দেখা দেয়।
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের আয় কমে গেছে। অনেকেই কাজে বের হতে না পারায় দিনভর বেকার সময় কাটিয়েছেন। যারা বের হয়েছেন, তাদের অনেককেই কাঁপুনি ও ঠাণ্ডায় জড়সড় অবস্থায় কাজ করতে দেখা গেছে। শীত নিবারণের জন্য বিভিন্ন এলাকায় খড়কুটো, কাঠ বা পুরনো কাপড় জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যায়।
তবে বিকেলের দিকে কোথাও কোথাও অস্পষ্ট করে হলেও সূর্য দেখা গেছে। সূর্যের ওই তাপে কুয়াশার ঘন চাদর পাতলা করা যায়নি। ফলে সন্ধ্যার পর পুরনো কুয়াশার সাথে যোগ হয়েছে নতুন কুয়াশা এবং আরো ঘন হতে দেখা যায়।
রাজধানীতে গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা ছিল চলতি শীত মৌসুমে ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের মানুষের নাকাল হওয়ার দিন শুরু হয়ে গেল। পুরো শীত ঋতুতে এই তিন বিভাগের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা কম থাকে।
বাসস জানায়, উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতো লালমনিরহাটেও ঘন কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের।
রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র রায় বাসসকে জানিয়েছেন, গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতা ছিল ১০০ শতাংশ। তিনি আরো বলেন, আগামী দুই দিন তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে এবং মাসের শেষ দিকে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কয়েক দিন ধরে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে দিনের আলোয়ও সড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। শীতে ঘরের বাইরে বের হতে পারছে না সাধারণ মানুষ। এর ফলে দিনমজুর, রিকশা-ভ্যান ও অটোচালকদের আয় অর্ধেকে নেমেছে। কৃষকরা শাকসবজি উৎপাদন ও সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর নদীতীরবর্তী ও গ্রামাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। জেলার খেটে খাওয়া মানুষ তীব্র শীত উপেক্ষা করেই জীবিকার তাগিদে কাজে বের হচ্ছেন।
জেলা সদরের বড়বাড়ী ইউনিয়নের ভ্যানচালক নাজমুল হক বাসসকে বলেন, পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কাজ করতে অনেকটা কষ্ট হচ্ছে। পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক আশরাফুল হক জানান, পেটের দায়ে কষ্ট সহ্য করেই মাঠে নামতে হচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলার অটোচালক শহিদুল হক বাসসকে বলেন, কয়েক দিন ধরে আয়ের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক আলী আকবর শীত ও কুয়াশার কারণে শাকসবজির ফলন নিয়ে উদ্বিগ্ন। একইভাবে হাতীবান্ধার কৃষিশ্রমিক জলিল হক বাসসকে বলেন, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় হাত-পা জমে গেলেও জীবিকার তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে।
এ দিকে জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে শীতে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা: তপন কুমার রায় জানান, সর্দি-জ্বর, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া বেশি দেখা যাচ্ছে। কিছু শিশুর শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও খিঁচুনি লক্ষ করা গেছে। তিনি অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেন, শিশুদের গরম পানি, পুষ্টিকর খাবার ও তাজা ফল-শাক খাওয়ানো জরুরি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো: সাইখুল আরিফিন বাসসকে বলেন, শীত ও ঠাণ্ডার মধ্যে আপাতত ফসল নিরাপদ রয়েছে এবং কৃষকদের ক্ষতি রোধে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার জানান, শীতের তীব্রতা বিবেচনায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।



