সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসা না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান প্রফেসর ডা: এফ এম সিদ্দিকী।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক নাগরিক শোকসভায় তিনি এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, ভুল ওষুধের প্রয়োগ বেগম জিয়ার লিভারকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, যা অনেকটা স্লো পয়জনিং বা ধীরগতির বিষক্রিয়ার মতো কাজ করেছে।
এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ২০২১ সালের এপ্রিলে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমরা, বর্তমান মেডিক্যাল বোর্ড, বেগম জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। ভর্তির সাথে সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা অত্যন্ত বিস্ময় ও উদ্বেগের সাথে দেখতে পাই যে ম্যাডাম লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত এবং মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে ওনাকে ‘মিথোট্রেক্সেট’ নামের একটি ট্যাবলেট আর্থ্রাইটিসের জন্য নিয়মিত খাবার নির্দেশ দেয়া আছে এবং ওনাকে ভর্তি থাকা অবস্থায় খাওয়ানো হয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিক এই ওষুধটি খাওয়ানো বন্ধ করি। ম্যাডাম রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং রিউমাটলজিস্টদের পরামর্শে এই ওষুধটি খাচ্ছিলেন। পাশাপাশি ওনার ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ছিল।
তিনি বলেন, ম্যাডামের লিভারের অসুখ নির্ণয় করা খুবই সহজ একটি কাজ ছিল, এর জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ‘মিথোট্রেক্সেট’ খাওয়ালে নিয়মিত রক্তে লিভার ফাংশনের কয়েকটা উপাদান পরীক্ষা করে দেখতে হয় এবং অস্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে ন্যূনতম পেটের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করে লিভারের অবস্থা দেখতে হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে ম্যাডামের লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ দেখার পরও সরকারনির্ধারিত চিকিৎসকরা একটা আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং ‘মিথোট্রেক্সেট’ বন্ধ করেননি। তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে ম্যাডাম ওখানে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি, কিন্তু অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে ওনার আস্থাভাজন চিকিৎসক দিয়ে বেড সাইডে আলট্রাসনোগ্রাফি সহজেই করা যেত। নিদেনপক্ষে ‘মিথোট্রেক্সেট’ বন্ধ করে দেয়া ছিল অবশ্য কর্তব্য।
এফ এম সিদ্দিকী বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন ম্যাডামকে কি স্লো পয়জন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে- ‘মিথোট্রেক্সেট ছিল সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভার রোগকে দ্রুত বাড়িয়ে লিভারের সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, এটি তার লিভারের জন্য ধীরে কাজ করে বিষের মতো আচরণ করেছে।
তিনি বলেন, আজ দেশের লক্ষকোটি মানুষের বুকের ভেতর একটা আফসোস- সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! যদি দেখতে পেতেন মানুষ নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে! বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এ ধরনের অবহেলা, লিভার ফাংশন দ্রুত অবনতি ওনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটা ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এটা অমার্জনীয় অপরাধ এবং এটা ওনাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ছাড়াও ওনার ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে আছে। এ বিষয়ে আইনগতভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে ম্যাডামের চিকিৎসাজনিত অবহেলার তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন :
ক. সরকার কর্তৃক গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন দক্ষতার ভিত্তিতে তারা ম্যাডামের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর বর্তায় কি না।
খ. ভর্তিকালীন সময় কারা ওনার চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
গ. মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা চলাকালীন ম্যাডাম আইনজীবীর মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন কী কারণে সেটি হয়নি বা কারা বাধা দিয়েছিল।
এফ এম সিদ্দিকী বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ম্যাডামের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিএমইউর সব ডকুমেন্ট আইনগতভাবে জব্দ করা দরকার এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে ম্যাডামের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশা করি। আমরা জানি- ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া।



