কূটনৈতিক প্রতিবেদক
‘বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারত যে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, সেটাই প্রকৃত সম্প্রদায়িকতা’ মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইস্যু হবে ভারতবিরোধিতা। বাংলাদেশে এতটা প্রকটভাবে ভারতবিরোধিতা কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে একক ইস্যু কখনো এতটা শক্তিশালী ছিল না। এর জন্য দায়ী বাংলাদেশের সাথে ভারতের বৈরী আচরণ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে ভারত এ ধরনের আচরণ করার সাহস পায় না। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ভারত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এমনকি ভুটানও এখন ভারতকে পাত্তা দেয় না। ভুটানের সাথে চীনের আলাদা যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান এ সব মন্তব্য করেন। জাতীয়তা যাচাইয়ের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদের ব্যাপারে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ঘোষণা এবং ইসরাইলি কায়দায় বাংলাদেশকে সবক শিখানো সম্পর্কিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বিরোধী দলনেতা বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যকে ‘নির্বোধ’ হিসাবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুভেন্দু অধিকারী যে কত বড় অপদার্থ, মিথ্যাবাদী ও ভেল্কিবাজ তা এখন শিক্ষিতসমাজে পরিষ্কার হয়ে গেছে। মাঝে এমন খবরও বের হয়েছিল, শুভেন্দু অধিকারী তার এক মুসলিম বন্ধুর বাড়িতে গরুর মাংস খেয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শুভেন্দু তা অস্বীকার করতে পারেনি। অথচ তিনি প্রকাশ্যে কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী।
ভারতের অরুণাচল রাজ্যকে নিজের ভূখণ্ড হিসাবে চীনের দাবি আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের উচিত হবে অরুণাচল প্রদেশের মানচিত্র পাল্টে দেয়ার চীনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন জোগানো। ভারত যতই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিজের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী দেখাক না কেন, তার কোনো স্ট্র্যাটিজি নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের প্রোপাগান্ডা পশ্চিমা বিশ্ব বুঝে গেছে। বাংলাদেশে একজন হিন্দু মারা গেলে ভারত তা বিরাট করে প্রচার করে। কিন্তু এর পাশাপাশি ১০ জন মুসলমানতো মারা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কেউ তো পার্থক্য করে না। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কার্যক্রম বাংলাদেশে খুবই শক্তিশালী। এ জন্য ভারত সুবিধা করতে পারছে না। ভারত ইহুদি লবির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো সমর্থন পায় না। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা আসার পরও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাক্ষাৎ না করাটা অকূটনৈতিক সুলভ আচরণ বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ অভিবাসীদের হটাতে আসাম সরকার কঠোর অবস্থান নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন করার ক্ষেত্রে ‘নরম নীতি’র যুগ শেষ হয়ে গেছে। ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘অভিবাসী’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকেই নির্বাচন ক্যাম্পেইনে মূল এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরছেন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই নেতা।
এতে বলা হয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ সমর্থনেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, তার রাজ্যে কাউকে বিদেশী হিসেবে সাব্যস্ত করা হলেই তাকে দেশছাড়া করা হবে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে না। অবৈধ অভিবাসী নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক মন্তব্য রাজ্য সরকারের কৌশলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আগে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে যাচাইসহ দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতো। সেই নীতিতে পরিবর্তন এসেছে জানিয়ে হিমন্ত বলেন, ‘এখন কাউকে বিদেশী ঘোষণা করে আদেশ জারি হলে তাকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদ করা হবে। আমরা আর আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষা করব না।’
অন্য দিকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাসকে হত্যার প্রতিবাদে সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ হয়েছে। পড়শি দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। ঢাকার ওপর এই মর্মে চাপ তৈরি করেছে নয়াদিল্লিও। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো রাজনৈতিক বিক্ষোভ হয়েছে কলকাতাতেও। এমনই এক কর্মসূচিতে কলকাতায় বাংলাদেশের উপদূতাবাসের সামনে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু বলেন, ইসরাইল যেভাবে গাজাকে শিক্ষা দিয়েছে, ওইভাবে আমাদের ভারতের ১০০ কোটি হিন্দু দেশের সরকার বাংলাদেশকে শিক্ষা দেবে। অপারেশন সিঁদুরে যেভাবে আমরা পাকিস্তানকে সবক শিখিয়েছি, সেভাবেই বাংলাদেশকে সবক শেখানো উচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শুভেন্দুর ওই বক্তব্যকে অবশ্য অনেকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করে দেখতেই রাজি নন। বিজেপির এক ‘আদি’ নেতা যেমন বলেই দিলেন, ‘আসলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে মাথায় রেখেই শুভেন্দু আগ্রাসী হিন্দু তাস খেলতে শুরু করেছেন। এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের রাজনীতি বা বাংলাদেশের বিশৃঙ্খলা বাংলায় বা ত্রিপুরায় যে প্রভাব ফেলে, দেশের আর কোথাও তা নয়।’ মনে করিয়ে দিলেন, ফিলিস্তিন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের কথাই শুভেন্দু এক বন্ধনীতে এনেছেন এবং তিনটিই মুসলমান-প্রধান দেশ। তৃণমূলের শশী অবশ্য মনে করছেন, ‘এ রাজ্যে হিন্দু তাস খেলে কোনো লাভ নেই। মানুষ উন্নয়নের পক্ষেই ভোট দেবে। এখানকার হিন্দুরা বিপদে নেই। বিপদে রয়েছে বিজেপি।’



