চেলা নদীর পাড় কেটে চলছে বালু লুটের মহোৎসব

বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক

Printed Edition
দোয়ারাবাজারে চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনে বিলীনের দৃশ্য 	:  নয়া দিগন্ত
দোয়ারাবাজারে চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনে বিলীনের দৃশ্য : নয়া দিগন্ত

সোহেল মিয়া দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)

একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সোনালী চেলা নদী। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, দুই তীরে কাশফুলের শুভ্রতা আর সবুজে ঘেরা গ্রামীণ জনপদ; সবমিলিয়ে নদীটি ছিল স্থানীয়দের গর্ব এবং ভ্রমণপিপাসু মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র। সীমান্তঘেঁষা নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিনপাড়া ও পূর্বচাইরগাঁও গ্রামের মাঝ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এই নদী এখন ভাঙন ও বালু লুটের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

নদীর বুকে স্বাভাবিক স্রোত আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বদলে এখন চলছে অবাধ বালু উত্তোলন। অভিযোগ উঠেছে, ইজারার আড়ালে একটি প্রভাবশালী চক্র নদীর তীর কেটে বালু তুলছে। এতে শুকনো মৌসুমেও নদীর পাড় ধসে পড়ছে, বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক। সম্প্রতি নির্বাচন ঘিরে কয়েক দিনের ছুটি। আর প্রশাসন যখন নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত, এ সুযোগে ফের সক্রিয় হয় বালু খেকো সিন্ডিকেট। রাতে কিংবা দিনের আলোতে সমান তালে চলেছে বালু লুট।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চেলা নদীর বালুমহাল থেকে প্রতি বছর জেলা প্রশাসন কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। কিন্তু সেই ইজারার শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের একটি অংশকে প্রভাবিত করে ইজারাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নদীর নির্ধারিত সীমানা উপেক্ষা করে তীরবর্তী জমি কেটে বালু উত্তোলন করছে।

সরেজমিন সারপিনপাড়া, পূর্বচাইরগাঁও, সোনাপুর, রহিমেরপাড়া, পূর্বসোনাপুর ও নাছিমপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে বড় বড় গর্ত ও কাটা অংশ স্পষ্ট। কোথাও নদী থেকে কয়েক গজ দূরের জমিও ধসে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দুই বছর ধরে নদীতে পর্যাপ্ত বালু না থাকলেও কোটি টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। ইজারার টাকা তুলতে গিয়ে নদীতীরের জমিই বালুর উৎসে পরিণত হয়েছে।

গত বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনে সারপিনপাড়া গ্রামের শতাধিক পাকা ও কাঁচা বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী। কয়েক শ’ একর ফসলি জমিও নদীতে চলে গেছে। এখনো নদীর তীরের অনেক পাকা বাড়ির একাংশ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। নদীর পানি কমে গেলে মাঝেমধ্যে কোথাও বালুর স্তূপ জেগে উঠলেও তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন থামছে না। স্থানীয়দের আশঙ্কা, অব্যাহত পাড় কাটার ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সারপিনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আজা মিয়া বলেন, নদীতে বালু নেই, তবু ইজারা দেয়া হচ্ছে। বালু তুলতে গিয়ে আমাদের ফসলি জমি কেটে নিচ্ছে। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি সব নদীতে যাচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, একটি প্রভাবশালী গ্রুপ সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন সংস্থাকে ‘ম্যানেজ’ করে বালু উত্তোলন করছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। তারা দাবি করেন, প্রতিবাদ করায় অনেককে মামলা ও হামলার হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে।

স্থানীয় এনসিপি নেতা হোসাইন আহমদ বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, সরকার বালুমহাল থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন নদীতীরবর্তী মানুষ। বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। ফসলি জমি হারিয়ে কৃষকের জীবিকা সঙ্কটে পড়েছে। গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে। নদীর তলদেশ ও তীরের গঠন পরিবর্তিত হলে ভাঙন তীব্র হয় এবং স্রোতের গতিপথ বদলে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়তে পারে।

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, নদীর পাড় কাটার অভিযোগ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি, তদন্ত নয়; অবিলম্বে বালুমহাল ইজারা স্থগিত করে নদীর তীর রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সোনালী চেলা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।