বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নীরব কিন্তু গভীর সঙ্কট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে- যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘স্ট্র্যান্ডেড অ্যাসেট’ বা কার্যত অকার্যকর উৎপাদন সম্পদ। কাগজে-কলমে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম এবং চুক্তিগতভাবে সুরক্ষিত। কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি, গ্রিড ও চাহিদার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব কেন্দ্র পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। তবু রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করছে কেবল ‘ক্ষমতা’ থাকার বিনিময়ে।
কী এই স্ট্র্যান্ডেড অ্যাসেট?
বিদ্যুৎ খাতে কোনো সম্পদকে স্ট্র্যান্ডেড বা আংশিক স্ট্র্যান্ডেড বলা হয়, যখন- বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকা সত্ত্বেও খুব কম সময়ে বা খুব কম লোডে চালানো হয়; উৎপাদন তুলনামূলকভাবে নগণ্য হলেও নির্ধারিত ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়; কেন্দ্রটি সিস্টেমের প্রকৃত চাহিদার চেয়ে চুক্তিগত সুরক্ষার ওপর বেশি নির্ভরশীল; গ্যাস, কয়লা বা ট্রান্সমিশন সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত চালানো সম্ভব হয় না।
এটি কোনো ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নয়, কিংবা জলবায়ু নীতির কারণে হঠাৎ সৃষ্ট সমস্যাও নয়। বরং অতিরিক্ত সক্ষমতা, জ্বালানি পরিকল্পনার ব্যর্থতা ও কঠোর চুক্তি কাঠামোর সম্মিলিত ফল হিসেবে এই সঙ্কট ইতোমধ্যেই বাস্তবে বিদ্যমান।
গ্যাস আছে কাগজে, বাস্তবে নেই
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে এই সঙ্কট সবচেয়ে প্রকট। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৮ অর্থবছরের পর থেকে দেশে গ্যাস উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এলএনজি আমদানি শুরু হলেও তা ছিল অস্থির ও অপর্যাপ্ত। অথচ এই সময়েই একের পর এক বড় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র অনুমোদন ও চালু করা হয়েছে।
ফলে দেখা যাচ্ছে- কেন্দ্র আছে, চুক্তি আছে, কিন্তু গ্যাস নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও বিপিডিবিকে দিতে হচ্ছে নির্ধারিত ক্যাপাসিটি চার্জ। একই ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা গেছে ট্রান্সমিশন লাইনের ক্ষেত্রেও। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলেও প্রয়োজনীয় গ্রিড অবকাঠামো না থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সিস্টেমে নেয়া যায়নি। তবু চুক্তি বহাল থেকেছে।
প্রকল্পে প্রকল্পে ‘স্ট্র্যান্ডিং’
রিলায়েন্স-জেরা মেঘনাঘাট প্রকল্প এই সঙ্কটের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকল্পটিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি আগে ভারতের সামালকোট গ্যাস প্রকল্পের জন্য কেনা হয়েছিল, যেটি নিজ দেশে গ্যাসসঙ্কটে কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সেই যন্ত্রপাতিই বাংলাদেশে এনে নতুন চুক্তির আওতায় উচ্চমূল্যে স্থাপন করা হয়। ফলে ভারতের একপ্রকার পরিত্যক্ত সম্পদ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ‘পূর্ণমূল্যের সম্পদে’ রূপ নেয়, ঝুঁকি বহন করে বিপিডিবি।
সামিট মেঘনাঘাট-২ (৫৮৩ মেগাওয়াট) কেন্দ্রটি দ্বৈত জ্বালানি (গ্যাস ও তরল জ্বালানি) সুবিধা থাকলেও বাস্তবে গ্যাসসঙ্কটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। আর তরল জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এত বেশি যে নিয়মিত চালানো অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। তবু কেন্দ্রটি চালু ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ চলছে।
পায়রা ১,৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহ ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা। কয়লা আমদানি, বন্দর সক্ষমতা ও ড্রেজিং বিলম্বের কারণে কেন্দ্রটি বহু সময় পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারেনি। এই সীমাবদ্ধতাগুলো আগে থেকেই জানা ছিল, তবু চুক্তি ও কমিশনিং এগিয়ে গেছে।
রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র চালু হয় এমন এক সময়ে, যখন দেশীয় গ্যাস কমছে, এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা পূর্ণ। কোনো নিশ্চিত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বরাদ্দ ছাড়াই কেন্দ্রটি চালু হওয়ায় এটি আজ কার্যত অনির্ভরযোগ্য সক্ষমতায় পরিণত হয়েছে।
কতটা বিদ্যুৎ কার্যত অচল?
জাতীয় পর্যায়ের এক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে- চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা: ৫,৬০০-৬,৭০০ মেগাওয়াট আর জ্বালানি ও অবকাঠামো সীমাবদ্ধতায় কার্যত অচল সক্ষমতা: ২,১০০-২,৮০০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে দেশে ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা কার্যত স্ট্র্যান্ডেড বা কাঠামোগতভাবে কম ব্যবহৃত।
এর আর্থিক ফল ভয়াবহ। কেবল ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাব করলেই প্রতি বছর রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার- বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৯০০ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর সাথে জ্বালানি ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রা সমন্বয় ও বিলম্ব সুদ ধরা হয়নি।
চুক্তিতেই ঝুঁকি রাষ্ট্রের
এই সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) একতরফা কাঠামোর কারণে। অনেক চুক্তিতে লিকুইডেটেড ড্যামেজ বা ক্ষতিপূরণ ধারা থাকলেও তা সীমিত, সময়সাপেক্ষ ও বিনিয়োগকারীবান্ধব। জ্বালানি সঙ্কট, গ্রিড সমস্যা বা ফোর্স মাজিউর দেখিয়ে বিনিয়োগকারীরা সহজেই দায় এড়াতে পারেন। কিন্তু বিপিডিবির ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়ার বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।
ফলে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ব্যর্থতা সরাসরি রূপ নেয় স্থায়ী সরকারি ব্যয়ে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের আগে বিদ্যমান স্ট্র্যান্ডেড সক্ষমতা মোকাবেলা না করলে সঙ্কট আরো বাড়বে। প্রয়োজন- অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার জন্য সাময়িকভাবে পেমেন্ট স্থগিতের সুযোগ; চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও নমনীয়তা; বাস্তবভিত্তিক চাহিদা পূর্বাভাস; এবং জ্বালানি ও গ্রিড পরিকল্পনার সাথে উৎপাদন সিদ্ধান্তের সমন্বয়।
নচেৎ, বিদ্যুৎ খাতে ‘উৎপাদন আছে, বিদ্যুৎ নেই’- এই বৈপরীত্যই আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ হয়ে থাকবে।



