বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসসঙ্কট শিল্প খাতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

চলমান গ্যাসসঙ্কট এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প খাত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এক বহুমাত্রিক সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প কারখানাগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রফতানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশে চলমান গ্যাসসঙ্কট এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প খাত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এক বহুমাত্রিক সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প কারখানাগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রফতানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর হলেও বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রতিদিন প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, ফলে শিল্প খাতে সরবরাহ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সঙ্কট আরো প্রকট হয়ে উঠেছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ দিকে গ্যাসসঙ্কটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও ধামরাইয়ের মতো এলাকায় অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ নেমে যাচ্ছে ১ থেকে ২ পিএসআই-এ, যেখানে স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ৭ পিএসআই। এমন পরিস্থিতিতে টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও কাচসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক কারখানা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন। ডিজেল, এলপিজি কিংবা সিএনজি ব্যবহার করে কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হলেও এসব জ্বালানির ব্যয় অনেক বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে অনেক কারখানা লোকসানের মুখে পড়ছে। একই সাথে নির্ধারিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও কাক্সিক্ষত সরবরাহ না পাওয়ায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি শিল্প খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে আমাদের কারখানাগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় দিনে কয়েক ঘণ্টাও গ্যাস পাওয়া যায় না, ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে। তিনি বলেন, অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যেতে পারে এটা দেশের জন্য বড় ঝুঁকি বলে তিনি মনে করেন।

টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের জন্য বিল দিচ্ছি পূর্ণহারে, কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছি অর্ধেকেরও কম। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি লাভের মার্জিন কমে গেছে। অনেক কারখানা এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা মনে করছেন।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, রফতানিমুখী তৈরী পোশাক খাতও এই সঙ্কটের কারণে চাপে রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, এই সঙ্কটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন। গত আট বছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩৭ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমানে দৈনিক সরবরাহের বড় একটি অংশই আমদানিকৃত এলএনজি থেকে আসছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্ঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাংলাদেশকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়াচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সঙ্কট মোকাবেলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি করা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।