শাহ আলম নূর ও কাওসার আজম বান্দরবান থেকে ফিরে
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি নীরব কৃষি বিপ্লব। ফল, সবজি কিংবা মসলার বাইরে এবার নজর কেড়েছে কাজুবাদাম, যার আবাদ যেমন লাভজনক, তেমনি বৈশ্বিক বাজারে রয়েছে এর বিশাল চাহিদা। চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এখন দিনকে দিন বাড়ছে কাজুবাদামের চাষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এটি শুধু একটি নতুন ফসল নয় বরং দেশের কৃষি অর্থনীতির সম্ভাব্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
কাজুবাদামের চাষ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ষাটের দশকে পাহাড়ি কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই বাদামের গাছ রোপণ শুরু হলেও দীর্ঘদিন তা ছড়িয়ে পড়েনি। কারণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাব, বাজার অজানা এবং সচেতনতার ঘাটতি পিছিয়ে রেখেছিল। তবে গত এক দশকে পরিস্থিতি বদলেছে। সরকারিভাবে চারা বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ এই তিনটির সমন্বয়ে কাজুবাদামের উৎপাদন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বাংলাদেশে কাজু বাদামের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১০ হাজার টন। বর্তমানে এর ৯০ ভাগই আমদানি করা হয় ভারত, ভিয়েতনাম ও নাইজেরিয়া থেকে। দেশী উৎপাদন গড়ে বছরে ১২০০ টনের আশপাশে। ফলে চাহিদা পূরণে এখনও বিশাল ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় বাজারে এক কেজি খোসাসহ কাজুবাদাম বিক্রি হয় ৫০০-৭০০ টাকা, আর প্রক্রিয়াজাত কাজু বাদাম বিক্রি হয় ১২০০-১৫০০ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী অর্গানিক কাজুর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে।
প্রকল্প ভিত্তিক কৃষি গবেষণার অংশ হিসেবে ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প’ কাজ শুরু করে ২০২০ সালের দিকে। প্রকল্প পরিচালক শহিদুল ইসলাম জানান, ‘কাজুবাদাম এমন একটি ফসল, যা একবার লাগালে কয়েক বছর ফল দেয়। রোগবালাই কম, যত্ন কম, কিন্তু আয় বেশি। পাহাড়ি এলাকার জন্য এটি আদর্শ।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে কাজুবাদামের আবাদ ছিল ২,০২১ হেক্টর জমিতে। সেখানে উৎপাদন হয় প্রায় ১৬১৬ টন। কিন্তু তিন বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৩১৭ হেক্টরে এবং উৎপাদন ৩,০৯৫ টনে। এই প্রবৃদ্ধি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় কাজুবাদাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
পাহাড়ি কৃষকদের মতে, এই বাদামের বাজারমূল্য অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, যেখানে এক কেজি আম বিক্রি হয় ৪০-৫০ টাকায়, সেখানে কাঁচা কাজুবাদাম কৃষক পাচ্ছেন ২০০ টাকার কাছাকাছি। ফলে অল্প জমিতে উচ্চ মুনাফার আশায় অনেকেই ধান বা অন্যান্য ফল বাদ দিয়ে কাজুবাদামে ঝুঁকছেন। দেশের কাজুবাদাম চাহিদা এখনও আমদানিনির্ভর। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকার কাজুবাদাম বাজার রয়েছে, যেখানে স্থানীয় উৎপাদন মেটায় মাত্র ১০ শতাংশ। প্রতি বছর বিদেশ থেকে আনতে হয় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টন কাজুবাদাম। ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
রাজধানীর কাওরান বাজারে ব্যবসায়ীরা জানালেন, এখন প্রতি কেজি কাঁচা কাজুবাদাম বিক্রি হচ্ছে ১,৬০০ থেকে ১,৭৫০ টাকায়। ভাজা বাদামের দাম ২ হাজার টাকা পর্যন্ত যাচ্ছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এই দাম ছিল ১,২০০ টাকার নিচে। বিক্রেতারা বলছেন, ‘আমদানি কমলে দাম আরও বাড়বে। স্থানীয় উৎপাদন না বাড়লে সাধারণ মানুষের নাগালে থাকছে না বাদাম।’
উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। বর্তমানে দেশে ২২টির মতো প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে ১৫টি সক্রিয়ভাবে উৎপাদনে রয়েছে। এসব কারখানায় মাসে হাজার টন বাদাম প্রক্রিয়া হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি কৃষকদের থেকে কাঁচা বাদাম সংগ্রহের একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বান্দরবানের একটি প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান ‘কিষাণঘর অ্যাগ্রো’ ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে আমরা মাত্র ১২০ জন কৃষক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। এখন আমাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত আছেন ৯৫০ জন। ধীরে ধীরে আমরা স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পেরেছি। এখন প্রতি মাসে ১০-১২ লাখ টাকার বাদাম বিক্রি করছি, ভবিষ্যতে রফতানিতেও যাব বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টতা বলছেন, প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে নারী শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বাদামের খোসা ছাড়ানো, রোস্টিং, প্যাকেজিং ইত্যাদি কাজে এখন পাহাড়ি এলাকার অনেক নারী যুক্ত হচ্ছেন। একটি ছোট যন্ত্রের সাহায্যে হাতে বা পা দিয়ে খোসা ছাড়ানোর কাজ করছেন তারা। এতে পরিবারে বাড়ছে আয়, পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে এই উদ্যোগ। কাজুবাদাম শুধু খাদ্য নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যসম্মত উপাদান হিসেবেও ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। এতে রয়েছে ফসফরাস, ভিটামিন বি ও ই, ফলিক অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক, ওলিক অ্যাসিড যা হৃদরোগ প্রতিরোধ, হাড় ও দাঁতের গঠন এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশে যদি পরিকল্পিতভাবে কাজুবাদামের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ বাড়ানো যায়, তা হলে অল্প সময়ে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। পাহাড়ি এলাকায় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি রয়েছে যেখানে এই বাদাম চাষ সম্ভব। তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আমরা প্রতি বছর কয়েকশ’ কোটি টাকার কাজুবাদাম রফতানি করতে পারি।’ বাংলাদেশের কৃষি এখন আর শুধু ধান বা পাট নির্ভর নয়। বৈচিত্র্যময় চাষ ও রফতানিযোগ্য ফসল উৎপাদনের মধ্য দিয়েই নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। পাহাড়ে কাজুবাদাম তারই একটি উদাহরণ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু পাহাড় নয়, গোটা দেশের জন্যই এটি হতে পারে কৃষি উন্নয়নের এক নতুন মাইলফলক।
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘কাজু গাছ কম পানি ও পাহাড়ি মাটিতে ভালো জন্মায়। এতে রাসায়নিক সার বা কীটনাশকও প্রয়োজন হয় না। এটি পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক ফসল। শুধু বাদাম নয়, কাজু আপেল থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনের সুযোগ বিশাল।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলছে পাহাড়ি অঞ্চলে কাজু বাদামের চাষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বহুকাল ধরে জনপ্রিয় এই উচ্চমূল্যের বাদাম এখন পাহাড়ের ঢালু জমিগুলোতে নতুন সম্ভাবনার বীজ বুনছে। আদা-হলুদের গন্ধ পেরিয়ে এখন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ছে কাজু বাদামের সবুজ বাগান। এক দশক আগেও যেসব জমিতে কেবল জুম চাষ বা বনজ উদ্ভিদের প্রাকৃতিক বিস্তার ছিল, সেসব জমিতেই এখন বিকশিত হচ্ছে শুষ্ক মৌসুমি উপযোগী কাজু গাছ। আর এর ফলে পাল্টে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য, বাড়ছে আয়, তৈরি হচ্ছে বাজার ও রফানির সম্ভাবনা।
বান্দরবান সদর উপজেলার জামছড়ি ইউনিয়নের কৃষক মংসুই মারমা বলেন, ‘তিন বছর আগে কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫০টি কাজু গাছ লাগাই। প্রথমে ফল কম ছিল, কিন্তু এ বছর ১০ কেজির বেশি বাদাম পেয়েছি। পাইকারি দরে ৭০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।’ জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বান্দরবানে কাজু বাদাম চাষ হয়েছে প্রায় ২,৩০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে লামা, আলীকদম ও রুমা উপজেলাগুলোতে চাষ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি হারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কাজু গাছের ফল বা ‘ড্র্পু’ অংশ থেকেই বাদাম পাওয়া যায়, কিন্তু ফলের উপরের অংশ, যাকে বলা হয় ‘কাজু আপেল,’ তা থেকেও তৈরি হয় জুস, সিরাপ, এমনকি ওয়াইন। যদিও বাংলাদেশে এখনও এই খাতে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে ওঠেনি, তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অংশটি ভবিষ্যতে নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্পের ভিত্তি হতে পারে।
খাগড়াছড়ি জেলার একজন নারী উদ্যোক্তা রুনা ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা পাঁচজন মিলে ১০ একর জমিতে কাজু গাছ লাগিয়েছি। এখন স্থানীয়ভাবে বাদাম ছাড়ানোর মেশিন বসিয়েছি। প্যাকেটজাত করে শহরে পাঠাচ্ছি। আগামী বছর অনলাইনে বিক্রি শুরু করব।’ পাহাড়ে কাজু বাদাম চাষকে ঘিরে কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের উৎসাহ ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই ধান বা পানের জমি ছেড়ে এখন কাজু গাছে মনোযোগ দিচ্ছেন। কারণ এটি দীর্ঘস্থায়ী ফসল এবং তিন বছরের মাথায় ফল দিতে শুরু করে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, ‘কাজু গাছ একবার লাগালে ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। কৃষকদের জন্য এটি একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। বাংলাদেশ যদি এই খাতে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানির সুযোগ তৈরি করতে পারে, তা হলে পাহাড় হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার কাজু হাব।’
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এর উপ-পরিচালক এম এম শাহ্ নেয়াজ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজু বাদাম শুকানো ও প্রসেসিং কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কৃষকদের যেন আর খোলা মাঠে শুকাতে না হয়।’ এ ছাড়া কাজু আপেল, যেটি পুষ্টিতে সমৃদ্ধ ও রসালো, তা সংগ্রহ ও রক্ষণে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই অংশ ব্যবহারে গবেষণা, বিনিয়োগ ও শিল্পের সংযোগ এখন সময়ের দাবি। বিশ্বব্যাপী কাজু বাদামের বাজার বর্তমানে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ এই বাজারে এখনো প্রবেশ করতে পারেনি। কারণ মান নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে রফতানি শুরু করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রার এক নতুন উৎস তৈরি হতে পারে।



