আল-আকসা, গাজা ও উম্মাহ প্রশ্নে সংগঠিত প্রতিরোধে ফেরার আহ্বান

সমাপনী ঘোষণায় গাজা ও আল-আকসা রক্ষায় নিরপেক্ষতার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান

Printed Edition

মাসুমুর রহমান খলিলী ইস্তাম্বুল থেকে

ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক খতিব ও দাঈদের তৃতীয় সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণায় মুসলিম রাষ্ট্রনেতাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, গাজা ও আল-আকসা রক্ষায় মুসলিম উম্মাহর একটি অভিন্ন ও সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। ঘোষণায় নিরপেক্ষতার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়, সীমান্ত খুলে দেয়া, পুনর্গঠনের উপকরণ প্রবেশের অনুমতি এবং আল-আকসা মসজিদের সুরক্ষায় কার্যকর হস্তক্ষেপকে নৈতিক অনুরোধ হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে মুসলিম দেশগুলোকে গ্রহণ করতে হবে।

দুই দিনব্যাপী ‘উম্মাহ আল-আকসা আন্তর্জাতিক সম্মেলন’ শেষে গতকাল সোমবার এই সমাপনী ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। ঘোষণায় বলা হয়, ফিলিস্তিন প্রশ্নে মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা ও বিভ্রান্তিকর রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিবৃতি নয়; বরং স্বাভাবিকীকরণ রাজনীতির প্রতি একটি নীরব কিন্তু সুস্পষ্ট চ্যালেঞ্জ এবং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও কৌশলগত অবস্থান।

সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘উম্মাহর মিম্বার থেকে আল-আকসা মসজিদ পর্যন্ত’- ইঙ্গিত দেয়, আবেগনির্ভর সহানুভূতির সীমা অতিক্রম করে সংগঠিত, টেকসই ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার পথে অগ্রসর হওয়ার সময় এসেছে।

সম্মেলনে ১৯৩১ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়, যা হাজী আমিন আল-হুসাইনি রহ:-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সম্মেলনই প্রথম আল-আকসাকে কেন্দ্র করে উম্মাহর সংগঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ঘোষণায় বলা হয়, আল-আকসা কোনো আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি ইসলামী পরিচয়, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও সভ্যতাগত অস্তিত্বের প্রশ্ন। ৯৩ বছর পরও একই সঙ্কট বিদ্যমান থাকায় ব্যর্থতার দায় কার- সে প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়।

গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে ঘোষণায় ‘নাজুক যুদ্ধবিরতি’র আড়ালে চলমান মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বাস্তুচ্যুত মানুষ খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে বসবাস করছে, খাদ্য ও চিকিৎসা সঙ্কট চরমে পৌঁছেছে এবং পুনর্গঠনের ওপর কার্যত অবরোধ বহাল রয়েছে। সম্মেলনের মতে, গাজা কেবল মানবিক সঙ্কট নয়; এটি রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত শাস্তির একটি ক্ষেত্র।

আল-আকসা প্রসঙ্গে ঘোষণায় সতর্ক করে বলা হয়, ২০২৬ সালের শুরুতেই মসজিদটি সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। এর কারণ হিসেবে দখলদার শক্তির ইহুদীকরণ প্রকল্প, স্থায়ী স্থানিক ও সময়ভিত্তিক বিভাজনের চেষ্টা, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা ও স্বাভাবিকীকরণমুখী নীতি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

সম্মেলনের সুপারিশে ‘দায়িত্বশীল সাক্ষ্যদানের ভূমিকা’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে উম্মাহকে আবেগি জনসমষ্টি নয়, বরং নৈতিক ও রাজনৈতিক সাক্ষ্যদাতা শক্তি হিসেবে পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়। এতে শুধু দোয়া নয়, কাঠামোবদ্ধ উদ্যোগ; শুধু বক্তব্য নয়, আন্তর্জাতিক চাপ; শুধু সহানুভূতি নয়, কার্যকর সংহতির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। স্থল ও নৌপথে সংহতির বহর পুনরুজ্জীবনের আহ্বানও জানানো হয়।

এ ছাড়া ‘সনদ ২০২৬’ নামে একটি ক্যাম্পেইনের ঘোষণা দেয়া হয়, যা সচেতনতা, সংগঠন ও আন্দোলনের সমন্বিত কাঠামো হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘উসমানের সানাদ’-এর ঐতিহাসিক প্রতীকের মাধ্যমে উম্মাহর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংহতির স্মৃতি পুনরুজ্জীবনের কথাও বলা হয়।

সম্মেলনে আলেম সমাজের ভূমিকা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফতোয়া প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ‘কোডিং কোর্স’ চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে বলা হয়, আধুনিক সঙ্কট মোকাবেলায় কেবল ফিকহি জ্ঞান নয়, কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও জরুরি।

সমাপনী ঘোষণায় বলা হয়, আল-আকসার প্রশ্ন আর বিলম্ব সহ্য করবে না। এটি বক্তৃতা থেকে কাঠামোতে, আবেগ থেকে দায়িত্বে এবং নীরবতা থেকে স্পষ্ট অবস্থানে যাওয়ার এখনই সময়। ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে- এই আহ্বানে উম্মাহ সাড়া দেয় কি না; আর তার ওপরই নির্ভর করবে আল-আকসার ভবিষ্যৎ ও মুসলিম বিশ্বের নৈতিক অবস্থান।