শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার রসুলপুর গ্রামের জয়তুন খাতুন ও রফিকুল ইসলাম দম্পতির উদ্যোগে কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব নানা ধরনের হস্তশিল্প পণ্য। ফুলের টব, ফুলদানি, বালতি, পাটি, ট্রে, ফলের ঝুড়ি, ডিম রাখার পাত্র, পাপোশ, মোড়া, টুপি, আয়নার ফ্রেম ও ডাইনিং টেবিলের ম্যাটসহ প্রায় ২০ ধরনের পণ্য তৈরি করছেন স্থানীয় শ্রমিকরা। এসব পণ্য রফতানি হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এ খাত থেকে বছরে প্রায় দুই কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কচুরিপানাকে ঘিরে সাঁথিয়া উপজেলার ১৫টি গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবারের কর্মসংস্থান হয়েছে। রসুলপুরে জয়তুন-রফিকুল দম্পতির কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কচুরিপানা কেনাবেচা ও পণ্য তৈরির কাজ চলে। সেখানে ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। অনেকে কারখানায় বসে পণ্য তৈরি করেন, আবার কেউ বাড়িতে কাজ করে তৈরি পণ্য কারখানায় জমা দেন।
সরেজমিন দেখা যায়, সাঁথিয়ার ঘুঘুদহ, গৌরীগ্রাম, দোপমাজগ্রাম, ধাতালপুর, ক্ষেতুপাড়া, মিয়াপুর, বহালবাড়িয়া, বানিয়াবছ, গাঙ্গোহাটিসহ এবং বেড়া উপজেলার জগন্নাথপুর, হাটুরিয়া ও নাকালিয়াসহ ১৫টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন কচুরিপানা বিক্রি করতে রসুলপুরের ওই কারখানায় আসছেন। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ মণ কাঁচা এবং ৬ থেকে ৭ মণ শুকনো কচুরিপানা কেনাবেচা হয়। প্রতি মণ কাঁচা কচুরিপানা ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা এবং শুকনো কচুরিপানা প্রায় দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়।
পণ্য তৈরিতে শ্রমিকদের মজুরিও নির্ধারিত হয় পণ্যের ধরন অনুযায়ী। বিভিন্ন আকারের ফুলের টব তৈরিতে ৫০ থেকে ১২০ টাকা, ফলের ঝুড়িতে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, ফুলদানি ও ট্রেতে ৪৫ থেকে ৮০ টাকা এবং আয়নার ফ্রেমে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেয়া হয়। কচুরিপানা সংগ্রহ, পরিবহন ও শুকানোর কাজ করেও শ্রমিকরা দৈনিক গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন।
জয়তুন খাতুন জানান, বিয়ের পর শ্বশুরের বেতের ব্যবসা দেখে তার স্বামীও বেতের ব্যবসা শুরু করেন। চার বছর আগে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় হস্তশিল্প রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বিডি ক্রিয়েশনে গিয়ে কচুরিপানা দিয়ে পণ্য তৈরির বিষয়ে জানতে পারেন তারা। পরে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করেন। বিডি ক্রিয়েশনের তিনজন প্রশিক্ষক তাদের গ্রামে এসে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন। এরপর স্থানীয় নারীদের এ কাজে যুক্ত করা হয়।
জয়তুন বলেন, বর্তমানে কারখানায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করে বিডি ক্রিয়েশনের কাছে সরবরাহ করছেন তারা। এ ছাড়া খুলনার একটি কারখানায় কচুরিপানা ও তৈরি পণ্য সরবরাহ করেন। সেখানে কচুরিপানা দিয়ে কাগজ, কাগজের পুতুল, নোটবুক, ওয়ানটাইম গ্লাস ও প্লেটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। তবে অর্থের অভাবে ব্যবসা বড় পরিসরে নিতে পারছেন না।
রফিকুল ইসলাম বলেন, কোম্পানি থেকে অর্ডার পাওয়ার পর নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে পণ্য তৈরি করতে হয়। এজন্য এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে, যার সুদের হার বেশি। কম সুদে সরকারি ঋণ পেলে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে।
কচুরিপানা বিক্রেতা সাঁথিয়ার ধাতালপুর গ্রামের ইন্তাজ আলী, মিয়াপুরের নাজমুল মিয়া ও বানিয়াবছ গ্রামের মজিবুর রহমান জানান, তারা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকার কচুরিপানা বিক্রি করেন। অন্যদিকে শ্রমিক রানী, বিলকিস, ছালমা ও সবিতা জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে তারা পণ্য তৈরির কাজ করেন। এতে পাওয়া আয় দিয়ে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত খরচ চালাতে পারছেন।
সাঁথিয়া উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, উদ্যোক্তারা আবেদন করলে তাদের ঋণ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় শতকরা আড়াই ভাগ সার্ভিস চার্জে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিডি ক্রিয়েশনের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মাহবুব আলম জানান, ২০২০ সাল থেকে তারা কচুরিপানা দিয়ে হস্তশিল্প পণ্য তৈরির কাজ করছেন। ওই বছরের শেষ দিকে জয়তুন-রফিকুল দম্পতির সঙ্গে তাদের কাজ শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আব্দুর রহমান আশিক বলেন, শুকনো কচুরিপানা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হয়। এসব পণ্য ইউরোপ, আমেরিকা, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে রফতানি হচ্ছে। আরো কয়েকটি দেশের সাথে আলোচনা চলছে।



