রাখাইনে রাষ্ট্রীয় ও আরাকান আর্মির সঙ্ঘাতে উভয় সঙ্কটে রোহিঙ্গারা

প্রত্যাবাসন নয়, উল্টো এসেছে দেড় লাখ

রাখাইনে দখল প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সঙ্ঘাতের কারণে রোহিঙ্গারা উভয় সঙ্কটে পড়েছে। দুই পক্ষই রাখাইনের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে তাদেরকে নিজ স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে এবং বাংলাদেশে থেকে প্রত্যাবাসন ঠেকাতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে। আর এ সব কারণে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার সরকারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরও গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখাইনে ফেরত পাঠানো যায়নি। উল্টো ২০২৩ সালের পর নতুন করে আরো দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition

রাখাইনে দখল প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সঙ্ঘাতের কারণে রোহিঙ্গারা উভয় সঙ্কটে পড়েছে। দুই পক্ষই রাখাইনের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে তাদেরকে নিজ স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে এবং বাংলাদেশে থেকে প্রত্যাবাসন ঠেকাতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে। আর এ সব কারণে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার সরকারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরও গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখাইনে ফেরত পাঠানো যায়নি। উল্টো ২০২৩ সালের পর নতুন করে আরো দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট উত্তর রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর ‘জাতিগত নিধন’ চালানোর পর বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরের বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর আগেও দফায় দফায় চালানো অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচতে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিকে মিয়ানমার তাদের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙ্গালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দায় এড়াতে চাচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তহবিল ক্রমান্বয়ে কমছে। রাখাইন থেকে নতুন আসা রোহিঙ্গারা এ তহবিলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তহবিল সঙ্কটের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সম্পর্কিত অনেক কার্যক্রম কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

উভয়ের দ্বারা নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসঙ্ঘ : জাতিসঙ্ঘের তদন্তকারীরা পশ্চিম মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘটিত হত্যা, যৌন সহিংসতা, গণগ্রেফতার এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন। রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইরত দুই পক্ষের মধ্যে এই জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আটকা পড়ে থাকায় তদন্তকারীরা দেশটির সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের দ্বারা সংঘটিত নির্যাতনের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন।

মিয়ানমারে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের সংস্থা ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’ সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। সংস্থাটি এমন সব প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছে, যা ভবিষ্যতে ফৌজদারি মামলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তদন্তধীন ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তয়েতে রোহিঙ্গা এবং জাতিগত রাখাইন বন্দীদের ওপর চালানো রাতের অভিযান, গণগ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ড।

তদন্তকারীরা মানবিক সহায়তার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ, চিকিৎসাসেবা দেয়া ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে বাধা এবং অনাহারজনিত মৃত্যুর খবর খতিয়ে দেখছেন। এই অনুসন্ধানে আরাকান আর্মির ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে, যা একটি রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র দল এবং মিয়ানমার সামরিক সরকারের সাথে লড়াইয়ে রাজ্যের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, তারা আরাকান আর্মির সদস্যদের দ্বারা রোহিঙ্গা নারীদের ওপর ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতার পাশাপাশি বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সম্মুখ সমরে নিয়োগ ও ব্যবহার এবং মসজিদ ধ্বংসের বিষয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। তদন্তকারীরা উত্তর রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এবং মংডোতে পুরো রোহিঙ্গা এলাকা উচ্ছেদের ঘটনাও নথিভুক্ত করেছেন, যে দু’টি এলাকা একসময় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র ছিল।

তদন্ত অনুসারে, যে স্থানগুলোতে আগে মসজিদ ছিল, কিছু ক্ষেত্রে সেগুলোকে অ-রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বসতি স্থাপনের জন্য নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের এই সংস্থাটি বলেছে, তারা সন্দেহভাজনদের রাজনৈতিক বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের তদন্ত করছে। এই ব্যবস্থাটি ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য এক হাজার ৬০০ এর বেশি উৎস থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

প্রাপ্ত তথ্যগুলো সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে বসবাসকারী লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, যাদের অনেকেই ২০১৭ সালের নৃশংস সামরিক দমনপীড়ন থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তাদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা ক্রমশ আরাকান আর্মির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা বিতর্কিত অঞ্চলের পরিস্থিতির সাথে জড়িয়ে পড়ছে। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘের তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকরা একাধিক দিক থেকে গুরুতর হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন।

আরেকটি ভিন্ন ঘটনায় মিয়ানমার সামরিক কর্তৃপক্ষ সিত্তয়ের আশপাশের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়গুলোকে পর্যায়ক্রমিকভাবে সামরিক সেবার জন্য লোক সরবরাহ করার একটি ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে : জাতিসঙ্ঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর মোট সংখ্যা বেড়েছে, অথচ তহবিল, যা আগে তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল, তা কমে গেছে। এতে একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে যা বদলায়নি তা হলো শরণার্থীদের দেশে ফেরার আকাক্সক্ষা। কিন্তু এই উপলব্ধি বাড়ছে যে, মিয়ানমারের নাজুক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এই কাজটি অত্যন্ত কঠিন, যা মিয়ানমার থেকে নতুন করে শরণার্থীদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আসতে উৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, তহবিল সঙ্কটের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন এবং সামাজিক সচেতনতা সম্পর্কিত অনেক কার্যক্রম কাটছাঁট করতে হয়েছে। শিক্ষামূলক কার্যক্রমে কাটছাঁটের একটি তাৎক্ষণিক ও ধারাবাহিক প্রভাব রয়েছে। এতে করে শিশুরা শিবিরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে, ভিক্ষা করতে পারে অথবা শ্রম ও নির্যাতনের শিকার হতে পারে। শিক্ষা হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশা এবং ভবিষ্যতে প্রত্যাবর্তনের জন্য বিনিয়োগ।

ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য সঠিক সমন্বয়ের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এ জন্য সংলাপ প্রয়োজন, কারণ রাখাইনের এই সঙ্ঘাতে এখন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং আরাকান আর্মি উভয়ই জড়িত। শরণার্থীদের এই প্রকৃত আশ্বাস প্রয়োজন, যে কারণে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল, সেগুলোর সমাধান হয়েছে। যখন সেই কারণগুলো দূর হবে, তখন শরণার্থীরা ফিরে যাবে। রাখাইনে সম্পদ থাকলে কেউ কেউ হয়তো সাথে সাথেই ফিরে যাবে, আবার অন্যদের বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ বা ব্যবসা আবারো শুরু করার জন্য আরো সময়, নথিপত্রের সহায়তা এবং আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন হবে। কিন্তু পরিস্থিতি প্রস্তুত হওয়ার আগেই লোকজনকে ফিরিয়ে দেয়া হলে হিতে বিপরীত হবে। রোহিঙ্গারা আবারো বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ : ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর থেকে বাংলাদেশ তার সীমান্ত ও হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, সীমিত ভূমি ও উচ্চ জনঘনত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে। বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে আমরা রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। তবে বাংলাদেশের এই মানবিক উদারতা আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। যে সঙ্কট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, সেই সঙ্কটের সমাধান বাংলাদেশ একা করতে পারে না।