গাজায় তীব্র শীতে চরম দুর্ভোগ তবুও ত্রাণ ঢুকতে বাধা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • সাহায্য প্রবেশে ইসরাইলকে চাপের আহ্বান
  • অর্থের বিনিময়ে স্থানচ্যুতি প্রস্তাবে কায়রোর ‘না’

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইলি গণহত্যার যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় শীতকালীন তীব্র আবহাওয়া ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। রোববার জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, এ অবস্থাতেও ‘প্রয়োজনীয় পরিমাণে ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।’

সংস্থার কমিশনার-জেনারেল ফিলিপ লাজ্জারিনি বলেছেন, ‘আরো বৃষ্টিপাত। আরো মানুষের দুর্দশা, হতাশা এবং মৃত্যু।’ গাজার মানুষ ‘ক্ষীণ, পুরাতন তাঁবু এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে আছে।’ লাজারিনি বলেন, যদি সাহায্যের প্রবাহ আসে, তাহলে ইউএনআরডব্লিউএ আগামীকালই এই প্রচেষ্টাগুলোকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

পৃথকভাবে ফিলিস্তিনি সরকার জানিয়েছে, তীব্র আবহাওয়ার মধ্যে বাস্তুচ্যুত মানুষের জরুরি মানবিক চাহিদা মেটাতে গাজায় প্রায় দুই লাখ প্রিফেব্রিকেটেড আবাসন ইউনিটের প্রয়োজন। সরকারের অপারেশন রুম এক বিবৃতিতে বলেছে, বর্তমান আবহাওয়ায় (ঝড়-বৃষ্টিও হচ্ছে) শহরজুড়ে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত তাঁবু প্লাবিত হয়েছে এবং অনেক তাঁবু উড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি শহরজুড়ে মানবিক জরুরি অবস্থা আরো তীব্র করে তুলেছে।

আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে গাজায় একটি মেরু নিম্নচাপ প্রবাহিত হচ্ছে। এটি চলতি শীত মৌসুমের তৃতীয় নি¤œচাপ- যার ফলে ভারী বৃষ্টিপাত ও তীব্র বাতাস বইছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজার ফিলিস্তিনিরা প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধেও টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। পূর্ববর্তী দু’টি আবহাওয়াগত নিম্নচাপে ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়েছে, বন্যার ফলে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত তাঁবু বিধ্বস্ত হয়ে চার শিশুসহ ১৭ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে।

আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে- বিশেষভাবে যারা জীর্ণ তাঁবুতে অথবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এই ভবনগুলো বারবার ইসরাইলি হামলার শিকার হচ্ছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংস হামলায় ইসরাইলি বাহিনী ৭১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে আরো এক লাখ ৭১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ। এই হামলায় শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

ইসরাইলের হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ ভবনের কারণে অধিকাংশ মানুষ এখন অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এ পরিস্থিতি রোগব্যাধি ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিস্কাশনী ব্যবস্থা বন্যার পানিকে দূষিত করছে এবং ভেঙে পড়া ভবনগুলো আরো বিপদ ডেকে আনছে। রোববার গাজা সিটির পশ্চিমে রেমাল এলাকায় প্রবল বাতাসে আংশিক ধ্বংস হওয়া একটি দেয়াল ভেঙে পড়ে এক নারীর লাশ পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় না নিতে সতর্ক করেছেন। তবে তাঁবু ভারী বৃষ্টি ও প্লাবনের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারছে না। গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মাসে অন্তত ১৫ জন, যার মধ্যে তিন শিশু রয়েছে, শীতজনিত কারণে মারা গেছে। সর্বশেষ দুই মাস বয়সী শিশু আরকান ফিরাস মুসলেহ অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় প্রাণ হারিয়েছে।

দূষিত বন্যার পানি : গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় আল জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি জানিয়েছেন, ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে ভারী বৃষ্টিতে গভীর জলাবদ্ধতা ও কাদা তৈরি হয়েছে। এতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, মানুষ কাদার মধ্যে হাঁটতে হিমশিম খাচ্ছে। এগুলো শুধু পানি নয়, এর সাথে রয়েছে নিকাশী ও আবর্জনা। একদল পৌরকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত নিকাশী নেটওয়ার্ক থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তাদের তাঁবুতে নিকাশীর পানি ঢুকে পড়ছে।

সাহায্য পৌঁছানোর আহ্বান : সহায়তা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছে, ইসরাইলকে চাপ দিতে হবে যাতে তারা জীবনরক্ষাকারী সাহায্য প্রবেশে বাধা না দেয়। সংস্থাগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী যে পরিমাণ সাহায্য আসার কথা ছিল, তার অনেক কম প্রবেশ করছে। জাতিসঙ্ঘের শীর্ষ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, আরো বৃষ্টি মানে আরো মানবিক দুর্ভোগ, হতাশা ও মৃত্যু। তিনি বলেন, কঠিন শীতকালীন আবহাওয়া দুই বছরেরও বেশি সময়ের দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। গাজার মানুষ দুর্বল তাবু ও ধ্বংসস্তূপে বেঁচে আছে। তিনি আরো বলেন, এ পরিস্থিতি অনিবার্য নয়। প্রয়োজনীয় পরিমাণ সাহায্য প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

আরো ইসরাইলি হামলা : অক্টোবরের ১০ তারিখে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার উত্তর গাজার জাবালিয়া শিবিরে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় তিন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী ইসরাইলি বাহিনী যে এলাকা থেকে সরে গিয়েছিল, সেখানেই হামলা চালানো হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানিয়েছেন, মধ্য গাজার বুরেইজ শিবিরের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি বিমান হামলা, রাফাহর পূর্বে গোলাবর্ষণ এবং গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে আরো হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেপ্টেম্বর মাসে ২০ দফা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলেন। এতে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির পর বৃহত্তর শান্তির পথে অগ্রসর হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রথম ধাপে গাজায় বন্দী বিনিময়, ইসরাইলি কারাগারের বন্দীদের মুক্তি এবং আংশিক সেনা প্রত্যাহার হয়েছে। তবে ইসরাইল এখনো প্রায় অর্ধেক এলাকা দখল করে রেখেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হামলা বন্ধ হয়নি এবং প্রতিশ্রুত সাহায্য প্রবেশ করছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় ৪১৪ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এক হাজার একশরও বেশি।

অর্থের বিনিময়ে স্থানচ্যুতি প্রস্তাবে কায়রোর ‘না’ : মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আবদুল আতি জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের স্থানচ্যুতি মেনে নিতে তার দেশকে দেয়া বড় অঙ্কের আর্থিক প্রস্তাব মিসর প্রত্যাখ্যান করেছে। এমবিসি মিসরের আল-হেকায়া টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আবদুল আতি জানান, মিসরকে তিনটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, যেখানে বিপুল অর্থের বিনিময়ে স্থানচ্যুতি অনুমোদনের কথা বলা হয়েছিল। প্রথম প্রস্তাবে মিসরের ঋণ মওকুফসহ বড় আর্থিক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের। তিনি বলেন, মিসর আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তথাকথিত ‘জঙ্গলের আইনকে প্রত্যাখ্যান করে।

তিনি বলেন, মিসর সব প্রস্তাবই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরাইলি আলোচকও মিসরের স্পষ্ট ও স্থায়ী অবস্থান ভালোভাবে বোঝে। আবদেল আতি উল্লেখ করেন, ইসরাইলের সাথে ৪৫ বছরেরও বেশি সময়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের পর উভয় পক্ষই একে অপরের অবস্থান ও শক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে। তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইসরাইল একটি দখলদার শক্তি হিসেবে সীমান্ত খুলে দিয়ে সাহায্য প্রবেশের দায়িত্ব পালন করা উচিত। কিন্তু ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করছে। আবদেল আতি জোর দিয়ে বলেন, মিসর আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন থেকে সরে আসা মানে ‘জঙ্গলের আইন’ অনুযায়ী জীবনযাপন করা।

যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে গাজা থেকে মুক্তি লাভ ১০ ফিলিস্তিনি বন্দীর : রোববার হামাসের সাথে যুদ্ধবিরতি ও বন্দী বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরাইল গাজা থেকে আটক ১০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর এ তথ্য জানিয়েছে। মুক্তিপ্রাপ্তদের আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল নিয়ে যায় চিকিৎসা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য। বর্তমানে ইসরাইলের কারাগারে ৯ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বন্দী রয়েছে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও আছে। ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দীদের ওপর নির্যাতন, অনাহার ও চিকিৎসা অবহেলার কারণে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ চলাকালে বন্দীদের ওপর নির্যাতন আরো বেড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ হামলায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার ৯০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার ২০০ জন। ভয়াবহ এ হামলায় গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।