আনাদোলু এজেন্সি
চলতি বছরের জুন থেকে কিউবার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে জানুয়ারিতে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় ওয়াশিংটন। পাশাপাশি দেশটির অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী ভেনিজুয়েলা থেকেও তেল পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। এতে কিউবার চলমান মানবিক সঙ্কট আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া সর্বশেষ পদক্ষেপগুলো বিশেষভাবে জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে। এর ফলে মানবিক প্রয়োজনেও কিউবার জন্য জ্বালানি আমদানি আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে দেশটি তীব্র জ্বালানি সঙ্কট ও বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে কিউবা ‘আরেকটি গাজা উপত্যকায়’ পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে নিযুক্ত একদল বিশেষজ্ঞ। গত মাসে কিউবা সফর করা মার্কিন কংগ্রেসের চার সদস্যও দেশটির বর্তমান পরিস্থিতির সাথে গাজার তুলনা করেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যকে কখনোই রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কিউবায় জ্বালানি, পরিবহন, সেচ ও মৌলিক সেবাগুলো একসঙ্গে ভেঙে পড়ছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও গ্রামীণ কৃষকদের ওপর। হাভানার বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার খবরও উল্লেখ করেছেন তারা। এতে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, কিউবার মানবিক পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই পূর্ণমাত্রার সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। এতে দেশটির মানুষের স্বাস্থ্য, জীবন, খাদ্য ও উন্নয়নের অধিকার গুরুতরভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
এ দিকে কিউবা নিয়ে মার্কিন নীতির পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার আরেক দেশ কলম্বিয়ার সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। নতুন নিরাপত্তা প্যাকেজের আওতায় কলম্বিয়াকে ১০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেয়ার কথা জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো ঘনিষ্ঠ করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে নতুন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী ট্রাম্প প্রশাসন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া এবং পুরো পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কলম্বিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে আরো সক্ষম করে তোলা হবে। একই সাথে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সক্ষমতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি এবং মার্কিন বাহিনীর সাথে যৌথ অভিযান জোরদার করা হবে।
অন্য দিকে গত ২০ জুলাই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ‘ঈঁনধ: ঞযব ঈধঢ়রঃধষ ড়ভ ২১ংঃ-ঈবহঃঁৎু ঈড়সসঁহরংস’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে কিউবার একদলীয় শাসনব্যবস্থাকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বহুমাত্রিক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞদের দাবি, কিউবা সন্ত্রাসবাদ বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সমর্থন দেয়, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ওই প্রতিবেদনে দেয়া হয়নি। তাদের আশঙ্কা, নিরাপত্তাগত কারণের চেয়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্যই কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের পেছনে বেশি ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপ জাতিসঙ্ঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। একই সাথে কয়েক দশক ধরে কিউবার ওপর চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এগুলো বৃহত্তর ‘শাসন পরিবর্তন’ কৌশলের অংশ বলেও তারা মনে করেন।
কিউবার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ধরনের হুমকি ও বৈরী কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে কিউবার পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য জরুরি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।



