আয়নায় ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল

রেকর্ড, বিতর্ক, বিস্ময় আর ভবিষ্যতের গল্প

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition

বিশ্বকাপের ১০টি স্মরণীয় মুহূর্ত

১. স্পেনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা : ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। আধুনিক, গতিময় ও দলীয় ফুটবলের দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

২. ব্রাজিলের অকাল বিদায় : শিরোপার অন্যতম দাবিদার ব্রাজিল শেষ ষোলোতেই নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি হিসেবে জায়গা করে নেয় এই ম্যাচ।

৩. নরওয়ের রূপকথা : শুধু ব্রাজিলকে হারানোই নয়, কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত উঠে পুরো বিশ্বকে চমকে দেয় নরওয়ে। প্রমাণ করে দেয় সাহস আর শৃঙ্খলা থাকলে তারকাবহুল দলকেও হারানো যায়।

৪. কেপ ভার্দের স্বপ্নযাত্রা : প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় কেপ ভার্দে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও দারুণ লড়াই করে তারা ছোট দলের বড় স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে।

৫. পেনাল্টির নতুন সমীকরণ : স্টাটার রান-আপে নেয়া একাধিক পেনাল্টি ব্যর্থ হয়। গোলরক্ষকদের প্রস্তুতি ও ডেটা বিশ্লেষণের কারণে পেনাল্টি আর নিশ্চিত গোলের সমার্থক থাকেনি।

৬. ভিএআর নিয়ে অবিরাম বিতর্ক : প্রযুক্তি থাকলেও বিতর্ক থামেনি। অফসাইড, পেনাল্টি ও লাল কার্ডের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

৭. লাল কার্ডে বদলে যাওয়া ম্যাচ : নকআউট পর্বে কয়েকটি লাল কার্ড ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। শৃঙ্খলার অভাব যে বিশ্বকাপে কত বড় মূল্য চোকাতে হয়- সেটিই আবারো প্রমাণিত হয়।

৮. তরুণদের বিশ্বকাপ : এই আসরে একঝাঁক তরুণ ফুটবলার নিজেদের বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ভবিষ্যতের ফুটবল যে নিরাপদ হাতে রয়েছে, সেটি বারবার ফুটে উঠেছে তাদের পারফরম্যান্সে।

৯. ৪৮ দলের বিশ্বকাপের সফল পরীক্ষা : নতুন ফরম্যাট নিয়ে শুরুর সংশয় থাকলেও ছোট দেশগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নতুন গল্প এবং বৈশ্বিক অংশগ্রহণ বিশ্বকাপকে আরো বিস্তৃত করেছে।

১০. ফুটবলের নতুন বার্তা : এই বিশ্বকাপ শিখিয়েছে শুধু তারকা দিয়ে ট্রফি জেতা যায় না। সংগঠিত দল, কৌশল, ফিটনেস এবং মানসিক দৃঢ়তাই এখন সাফল্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

শেষ কথা : ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়নের গল্প নয়; এটি ছিল নতুন শক্তির উত্থান, পুরনো ধারণার পতন এবং ফুটবলের বিবর্তনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আগামী চার বছর এই ১০টি মুহূর্তই বারবার ফিরে আসবে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে।

বিশ্বকাপ শেষ। ট্রফি উঠেছে স্পেনের হাতে। কিন্তু একটি বিশ্বকাপকে কি শুধু চ্যাম্পিয়নের নাম দিয়েই বিচার করা যায়? কখনোই না। কারণ বিশ্বকাপ মানেই শুধু নব্বই মিনিটের লড়াই নয়, এটি আবেগের মহাকাব্য, বিস্ময়ের রূপকথা, বিতর্কের আগুন, নতুন নায়কের জন্ম আর পুরনো কিংবদন্তিদের বিদায়ের মঞ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। এক মাসের এই মহাযজ্ঞ ফুটবলকে যেমন নতুন কিছু উপহার দিয়েছে, তেমনি রেখে গেছে অসংখ্য প্রশ্নও।

এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত ‘অঘটনের স্বাভাবিকতা’। আগে যেখানে বিশ্বকাপ মানেই ছিল ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য, সেখানে এবার মরক্কো, নরওয়ে, কেপ ভার্দে, মিসর কিংবা প্যারাগুয়ের মতো দল দেখিয়ে দিয়েছে ফুটবলে নাম নয়, পারফরম্যান্সই শেষ কথা। ব্রাজিলকে বিদায় করে নরওয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা কিংবা কেপ ভার্দের শেষ ষোলোয় পৌঁছানো বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ারই ইঙ্গিত।

অন্য দিকে স্পেনের শিরোপা জয়ও ছিল নতুন যুগের ঘোষণা। টিকি-টাকার পুরনো ছায়া নয়, বরং গতিময়, আক্রমণাত্মক ও আধুনিক ফুটবল খেলেই তারা বিশ্বসেরা হয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে তাদের ধারাবাহিকতা ছিল ঈর্ষণীয়। ফাইনালে আর্জেন্টিনার মতো অভিজ্ঞ দলকে হারিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, প্রতিভার সাথে পরিকল্পনা যোগ হলে বিশ্বকাপ জেতা অসম্ভব নয়। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। এটি চাট্টিখানি কথা নয়। গোল্ডেন গ্লাভস তো উনাই সিমনেরই প্রাপ্য।

ব্যক্তিগত কীর্তির দিক থেকেও বিশ্বকাপ ছিল সমৃদ্ধ। তরুণ তারকারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন সবচেয়ে বড় মঞ্চে। গোলের পর গোল, দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট, অবিশ্বাস্য গোলরক্ষকসুলভ সেভ সব মিলিয়ে ফুটবল যেন নতুন প্রজন্মের হাতে নিরাপদ ভবিষ্যতের বার্তা পেয়েছে। কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও শেষ বিশ্বকাপে নিজেদের মহত্ত্বের স্বাক্ষর রেখে বিদায় নিয়েছেন। ২০৩০ বিশ্বকাপে মনে হয় মাঠে দেখা যাবে না লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার, লুকা মডরিচ, রোমেলু লুকাকু ও ডি ব্রুইনাকে।

তবে গোলের পাশাপাশি আলোচনায় ছিল পেনাল্টিও। পুরো টুর্নামেন্টে স্টাটার রানআপ বা ছন্দ বদলে নেয়া পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। অনেক তারকাই গোলরক্ষকদের ধোঁকা দিতে গিয়ে নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়েছেন। গোলরক্ষকেরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত ছিলেন। ভিডিও বিশ্লেষণ, ডেটা এবং কৌশলগত প্রস্তুতি পেনাল্টির চিরাচরিত সমীকরণটাই যেন বদলে দিয়েছে। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা কোটি হৃদয় জয় করেছেন।

ফাউল আর লাল কার্ডের ঘটনাও কম ছিল না। কিছু ম্যাচে অতিরিক্ত শারীরিক ফুটবল খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে রেফারিদের কঠোর হতে হয়েছে। কয়েকটি লাল কার্ড ম্যাচের ভাগ্যই বদলে দিয়েছে। আবার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কোথাও ভিএরআর প্রশংসা পেয়েছে, কোথাও আবার প্রযুক্তি থাকতেও মানবিক ভুল প্রশ্ন তুলেছে। ফলে প্রযুক্তি ফুটবলকে আরো নিখুঁত করেছে- এমন দাবি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

রেফারিং নিয়ে বিতর্ক যেন এখন বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অফসাইড প্রযুক্তি, সেমি-অটোমেটেড ভিএআর, দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত নেয়া, সবকিছুই দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কেউ বলেছেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে। আবার কারো মতে, ফুটবলের স্বাভাবিক গতি হারাচ্ছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার প্রযুক্তির যুগেও শেষ সিদ্ধান্ত মানুষকেই নিতে হয়, আর সেখানেই বিতর্কের জন্ম।

ফিফার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকাপ ছিল আর্থিকভাবেও সফল। ৪৮ দলের সম্প্রসারিত আসর নিয়ে শুরুতে অনেক সংশয় থাকলেও দর্শক উপস্থিতি, সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ এবং বাণিজ্যিক আয়ে বিশ্বকাপ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, ছোট দেশগুলোও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। তবে সমালোচকরাও প্রশ্ন তুলেছেন বেশি ম্যাচ মানেই কি সব ম্যাচের মানও সমান থাকে?

এবারের বিশ্বকাপ আরো একটি সত্য সামনে এনেছে তারকানির্ভর ফুটবলের যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। যে দলগুলো একক নায়কের ওপর নির্ভর করেছে, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে। বিপরীতে সংগঠিত দল, শক্তিশালী বেঞ্চ এবং কৌশলগত বৈচিত্র্য থাকা দলগুলো শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।

সবশেষে, এই বিশ্বকাপ আমাদের কী শিখিয়েছে? ফুটবল আর পূর্বাভাসের খেলা নয়। এখানে র‌্যাংকিংয়ের চেয়ে সাহস বড়, নামের চেয়ে পরিকল্পনা বড়, আর ইতিহাসের চেয়ে বর্তমানের পারফরম্যান্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শক্তির উত্থান, প্রযুক্তির প্রভাব, তরুণদের আত্মপ্রকাশ এবং চিরচেনা বিতর্ক সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল পরিবর্তনের বিশ্বকাপ। চার বছর পর আবার বিশ্বকাপ আসবে। নতুন নায়ক জন্ম নেবে, নতুন রেকর্ড হবে, নতুন বিতর্কও তৈরি হবে। কিন্তু ২০২৬-এর বিশ্বকাপ মনে থাকবে একটি কারণে-এটি ফুটবলকে বুঝিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি এখনো প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে লিখতে জানে।

ক্ষতি ১৭ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বকাপের সময় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কাজকর্ম ফেলে বুঁদ হয়ে থাকে ফুটবলে। গত প্রায় দেড়মাস ধরে কাজে মানুষের মনোযোগ ছিল না। সবাই ব্যস্ত মেসি, এমবাপ্পে, ইয়ামাল, রোনালদো, হ্যারি কেন, নেইমারদের নিয়ে। ফুটবল দেখতে ব্যস্ত মানুষের কাজের ফাঁকির কারণে উৎপাদনশীলতায় বড় ঘাটতি দেখা দেয়। হিউম্যান রিসোর্স সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইউকেজি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদনশীলতার বিবেচনায় মার্কিন অর্থনীতির প্রায় ১১.৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী এই ক্ষতির পরিমাণ ১৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

কর্মক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম ‘এনভয়’-এর তথ্য অনুযায়ী, বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর দিন অর্থাৎ ৭ জুলাই মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অফিসে কর্মীদের উপস্থিতি ২৬ ভাগ কমে গিয়েছিল।

বিশ্বকাপ থেকে আয়

চলতি বিশ্বকাপ থেকে ফিফা রেকর্ড ১৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয়ের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। এটি টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নির্ধারিত ১১ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। আয়ের বড় অংশ এসেছে হসপিটালিটি ও টিকিট বিক্রি, বিশেষ করে চড়া দামের সেকেন্ডারি মার্কেট (টিকিট পুনঃবিক্রয়ের বাজার) থেকে। সেকেন্ডারি মার্কেটে ফিফা ক্রেতার কাছে থেকে ১৫ শতাংশ এবং বিক্রেতার কাছে থেকে আরো ১৫ শতাংশ কেটে রাখে। ফিফার এই বর্ধিত আয়ের সুফল পাবে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো।

আয়ের অর্থ পাবে বাংলাদেশও

ফিফার অর্থ বণ্টন প্রসঙ্গে সাবেক জাতীয় ফুটবলার জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু বলেন, বিশ্বকাপ থেকে ফিফা যে আয় করে, তার একটি অংশ বাংলাদেশসহ সব সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। ফিফার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই হলো সদস্য দেশগুলোর ফুটবলের উন্নয়নে সহায়তা করা। বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বাড়ানোর ফলে অনেক দেশের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো এখন মনে করছে, তাদেরও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বাছাইপর্বের প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হয়েছে।