বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ

মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কর্তৃক বাংলাদেশ জাতীয় দলের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেয়ার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে আইপিএলের সব ধরনের সম্প্রচার ও প্রচারকার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

গতকাল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব টেলিভিশন চ্যানেল ও সম্প্রচারমাধ্যমকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে যা বলা হয়েছে : চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আগামী ২৬ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া আইপিএলে বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) দল থেকে বাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো যৌক্তিক বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণকে ব্যথিত, মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। ফলে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত আইপিএলের সব খেলা ও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান বাংলাদেশে প্রচার বা সম্প্রচার বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

সরকারি ভাষ্যে ‘অনুরোধ’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে এটি কার্যত একটি প্রশাসনিক নির্দেশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট : মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনাটি কেবল ক্রীড়াঙ্গনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে রূপ নেয়। শনিবার আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রকাশ্যে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করার আহ্বান জানান। তার মতে, বাংলাদেশের খেলোয়াড়কে এভাবে অবমাননার জবাব রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই দেয়া প্রয়োজন।

এর পরদিন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে আইনি ভিত্তি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখানে একটি সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে। আমার চুপ করে বসে থাকার কোনো উপায় নেই।

তার সেই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি করা হলো।

বিসিবির কঠোর অবস্থান : বিশ্বকাপেও প্রভাব

ঘটনার রেশ গিয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও। মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদ ও নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জানিয়ে দিয়েছে- ২০২৬ আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দল ভারতে যাবে না।

রোববার আইসিসিকে পাঠানো এক চিঠিতে বিসিবি ভেনু পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়। উল্লেখ্য, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচই ভারতের মাঠে (তিনটি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

বিশ্লেষকদের মতে, আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ ও বিশ্বকাপ বয়কট- দু’টি সিদ্ধান্তই ক্রীড়ার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েনকে স্পষ্ট করে তুলছে।

আইনি ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন : আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘিরে কিছু আইনি ও বাণিজ্যিক প্রশ্নও উঠছে। সম্প্রচার স্বত্ব কেনা টেলিভিশন চ্যানেলগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, ‘জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদার প্রশ্নে অর্থনৈতিক ক্ষতি গৌণ।’

অন্যদিকে, মোস্তাফিজ নিলামে পাওয়া ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির পুরো অর্থ পাবেন কি না- তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রচার লাইসেন্স রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার এ ধরনের নির্দেশনা দিতে পারে, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মন্তব্য : ক্রীড়া বিশ্লেষকরা বলছেন, আইপিএলের মতো বাণিজ্যিক লিগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নতুন নয়, তবে একটি দেশের জনপ্রিয় খেলোয়াড়কে হঠাৎ বাদ দেয়ার ব্যাখ্যা না থাকা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করেছে। তাদের মতে, মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত যদি শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় না হয়ে থাকে, তাহলে তা দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া রাজনীতিতে নতুন এক নজির হয়ে থাকবে। এক বিশ্লেষক বলেন, আইপিএল এত দিন নিজেকে ক্রীড়া-বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরলেও এবার সেটি রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে টানাপড়েনের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। একজন সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা কেবল মোস্তাফিজের ইস্যু নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের সম্মান ও সমতার প্রশ্ন।’

ভারতীয় গণমাধ্যমে যা বলা হচ্ছে : ভারতের শীর্ষ কয়েকটি ক্রীড়া ও রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যমে মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অস্বচ্ছ’ ও ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রিকেটভিত্তিক পোর্টাল ক্রিকবাজ, দ্য ওয়্যার স্পোর্টস এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়, মোস্তাফিজ ফিটনেস ও পারফরম্যান্স- দুটো দিক থেকেই কার্যকর একজন বোলার ছিলেন। হঠাৎ করে তাকে বাদ দেয়ার কোনো স্পষ্ট ক্রীড়াগত ব্যাখ্যা নেই। কয়েকটি ভারতীয় টিভি টকশোতেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে- আইপিএলের মতো একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে কি ক্রীড়ার বাইরে অন্য কোনো বিবেচনা প্রভাব ফেলছে কি-না। যদিও বিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

সামনে কী হতে পারে : আইসিসি সূত্র জানায়, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এটিকে আপাতত বিসিসিআই ও বিসিবির দ্বিপক্ষীয় ইস্যু হিসেবেই দেখছে। তবে সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বকাপের সূচি ও সম্প্রচারে বড় প্রভাব পড়তে পারে।

আইসিসি সূত্র আরো জানিয়েছে, আগামী দুই দিনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বৈঠক হবে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এটিকে মূলত বিসিসিআই ও বিসিবির দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবেই দেখছে। বড় ধরনের সূচি পরিবর্তনে তারা অনাগ্রহী। তবে বাংলাদেশের অবস্থান যদি অনড় থাকে, তাহলে এই সঙ্কট কেবল আইপিএল বা একটি বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না- দ্বিপক্ষীয় ক্রীড়া সম্পর্কেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।