কূটনৈতিক প্রতিবেদক
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গো জিয়াকুন বলেছেন, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার লক্ষ্য কোনো তৃতীয় পক্ষ নয়। দু’দেশের সম্পর্ক তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত হওয়া উচিত।
বেইজিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র এ কথা বলেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশের সরকারি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ অন্যান্য নদীর পাশাপাশি তিস্তা নদীর প্রকল্প নিয়েও একটি সহযোগিতামূলক চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছেছে। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা সহযোগিতা নিয়ে ভারতের গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এটি ভারতের সীমান্ত এবং উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর খুব কাছে অবস্থিত। ভারতের এই উদ্বেগকে চীন কীভাবে দেখে এবং দুই নেতার (চীন ও বাংলাদেশ) মধ্যে এই উদ্বেগগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না?
জবাবে জিয়াকুন বলেন, বাংলাদেশের সাথে চীন উন্নয়ন কৌশলে বৃহত্তর সমন্বয় সাধনে এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিনিময় ও সহযোগিতা বাড়াতে প্রস্তুত। তিস্তা নদীর ব্যাপক সংস্কার ও পুনর্বাসন একটি জীবিকানির্ভর প্রকল্প, যেটিকে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। এই প্রকল্পে সহায়তা করার জন্য চীন তার সাধ্যমতো সব কিছু করতে প্রস্তুত। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার লক্ষ্য কোনো তৃতীয় পক্ষ নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত হওয়া উচিত।
বেইজিং ইয়থ ডেইলির এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৭তম গ্রীষ্মকালীন দাভোসে অংশগ্রহণ এবং চীন সফর করেন। তিনি সফরকালে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং এনপিসির (ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস) স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সাথে যথাক্রমে সাক্ষাৎ ও আলোচনা করেন। এ সময় তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়াবলি নিয়ে গভীর মতবিনিময় করেন। এই সফরে ব্যাপকভিত্তিক অভিন্ন বোঝাপড়া এবং ধারাবাহিক বাস্তব সহযোগিতামূলক ফলাফল অর্জিত হয়েছে, যা চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। সফরের তিনটি প্রধান দিক হলো, প্রথমত, একে অপরকে অবিচল পারস্পরিক সমর্থন প্রদান। দুই দেশের নেতারা নতুন যুগে একটি অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছেন। উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় একে অপরকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করবে, শাসনব্যবস্থাবিষয়ক অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়াবে, কৌশলগত যোগাযোগ গভীর করবে এবং রাজনৈতিক আস্থা বৃদ্ধি করবে। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশ এক-চীন নীতির প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। দ্বিতীয়ত, পারস্পরিকভাবে লাভজনক সহযোগিতা আরো গভীর করা। উভয় পক্ষ উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে, উন্নয়ন কৌশলগুলোকে আরো সমন্বিত করতে, বন্দর ও পানি সংরক্ষণের মতো প্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে, বাণিজ্য, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল এবং অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তথ্য ও যোগাযোগের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা প্রসারিত করতে এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশ একাধিক সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখা। উভয় পক্ষ জাতিসঙ্ঘ এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় কাঠামোতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বৃদ্ধি করবে, একটি সমতাভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বহুমেরু বিশ্ব ও একটি সার্বজনীনভাবে লাভজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে উৎসাহিত করবে এবং যৌথভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলাফল ও জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করবে।
জিয়াকুন বলেন, বেইজিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা আরো গভীর করতে, উন্নয়ন কৌশলগুলোতে আরো ভালো সমন্বয় করতে, ফলপ্রসূ সহযোগিতা প্রসারিত করতে, ঘনিষ্ঠতর জনসম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করতে, বহুপক্ষীয় সমন্বয় জোরদার করতে এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের সুফল দ্বারা উভয় দেশ ও দুই দেশের জনগণকে আরো বেশি উপকৃত করতে ঢাকার সাথে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।



