কূটনৈতিক প্রতিবেদক
রোহিঙ্গা সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে মন্তব্য করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, আরাকান আর্মি, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বার্থের সঙ্ঘাতের কারণে এই সঙ্কট দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এই সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে প্রবাসী বাংলাদেশী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘আসন্ন জাতিসঙ্ঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং’ বিষয়ক এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। ‘সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশী’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে। এবারের অধিবেশনে দারিদ্র্যবিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি প্রতিরোধ, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন অধিকার ঘোষণার ৪০তম বার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, আসন্ন জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আওতায় দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়নের সুযোগ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন। এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা ও নতুন আকাক্সক্ষার প্রতীক। তিনি জানান, বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো ইউএনজিএর অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করবেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। তাই অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, সরকার ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনতে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের ওয়ান-স্টপ সেবা দিতে সরকার ‘বাংলাদেশ ইনভেস্ট’ ফ্রেমওয়ার্ক চালু করেছে এবং কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিনিয়োগসংক্রান্ত অন্যান্য প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণ করছে। এ ছাড়া নাগরিকদের সব তথ্য একটি একক ডেটাবেজে নিয়ে আসতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ নিয়ে কাজ চলছে। তিনি জানান, প্রবাসী বাংলাদেশীদের সেবা সহজতর করতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ২০২৭ সালের মধ্যে দুই লাখ ‘প্রবাসী কার্ড’ ইস্যু করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সুযোগ, ঐতিহ্য, পর্যটন, সৃজনশীল শিল্প এবং রফতানিযোগ্য পণ্যগুলোর প্রচারণায় প্রবাসীদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন।
অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচারকারী চক্রের নানাবিধ কর্মকাণ্ড বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং বৈধ উপায়ে দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করতে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাথে কাজ করছে। ইতোমধ্যে যেসব জেলা থেকে অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পৃথক মাইগ্রেশন উইং চালু করা হয়েছে। নতুন এই শাখা অবৈধ অভিবাসন, প্রবাসীদের নানা সমস্যা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করবে।
ব্যবসা, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে মন্ত্রিসভা সম্প্রতি বাংলাদেশের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন এনেছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে আরো বেশি অতিথিপরায়ণ ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলা। এর পাশাপাশি বিমানবন্দর সেবা ও পর্যটন খাত সংস্কারের কাজও চলছে।
জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং একক কোনো বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অতিরিক্ত উৎসের পাশাপাশি আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাই করছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে সরকার সচেষ্ট।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশীর চেয়ারম্যান এম এস সেকিল চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক উন্নয়নগুলো তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সিরিজ’-এর অংশ হিসেবে আজকের আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বদেশে বিনিয়োগ ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করা।



