ঢাকার ময়লা ব্যবস্থাপনা ঘিরে বাণিজ্যিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ : ড. আদিল মুহাম্মদ খান

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা শহরে ময়লা ব্যবস্থাপনা ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। নাগরিকরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করার পরও তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এই অস্বচ্ছ ব্যবস্থা চাঁদাবাজি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সিটি করপোরেশন চাইলে আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ময়লা সংগ্রহ ও অপসারণ প্রক্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের অবসান ঘটাতে পারে মনে করেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান। গতকাল শনিবার তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, একইভাবে ফুটপাথ, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে শক্তিশালী দখলদার চক্র গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির কারণে এসব দখলদারিত্ব বছরের পর বছর টিকে থাকে। এতে নাগরিকদের চলাচল, পরিবেশ ও জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পিত নগর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়েছে। শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নগর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মিরপুরের কাফরুলে নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কাফরুলে ইউসুফ আলী হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিরোধে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; এই ধরনের সঙ্ঘাতের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও ভেঙে দিতে হবে। অবৈধ অর্থনীতির উৎস বন্ধ না করলে ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও সহিংসতার চক্র অব্যাহত থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে নগরের বিভিন্ন সেবা ও ব্যবস্থাপনায় অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব নির্মূল করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ড. আদিল মুহাম্মদ খান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক পদ-পদবি ব্যবহার করে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থ উপার্জনে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা উচিত। একই সাথে ময়লা সংগ্রহ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় এনে নাগরিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ করতে হবে। ফুটপাথ, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখলমুক্ত করতে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন তিনি। নগরসেবাভিত্তিক সব ইজারা, চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

ড. আদিল বলেন, দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নগর প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জোরদার করা। নগর ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অবৈধ অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের চিহ্নিত করে তা নির্মূলে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে দখলদারিত্বের পালাবদল আমাদের শহরকে আরো বিপন্ন করে তুলছে। নগরসেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অবসানে প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কার্যকর স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ নগর ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। অন্যথায় নগরের বিভিন্ন সেবা ও সম্পদ দখলকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাত, সহিংসতা ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।