কৌশলগত নীরবতা জামায়াতের !

অল্প ব্যবধানে হার অর্ধশত আসনে : ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ

জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে আপাতত তাৎক্ষণিক আন্দোলনের পরিবর্তে ফল বিশ্লেষণ ও সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। পুনর্গণনা বা অডিটের মাধ্যমে ব্যালট যাচাই করা হলে, কিছু ক্লোজ কনটেস্ট আসনে প্রকৃত ফলাফলের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে স্থানীয় নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংগঠন শক্তিশালী করার লক্ষ্য এখন দলটির অগ্রাধিকার হতে পারে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে কয়েকটি আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-জোটের প্রার্থীরা অস্বাভাবিকভাবে কম ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। দলের সমর্থকরা অভিযোগ করছেন, এই ৫৩টি আসনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা ভোট হেরফেরের মাধ্যমে ফল পরিবর্তিত হয়েছে। গণনার সময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাতভিত্তিক ফল প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সমর্থক মহলে অভিযোগ, এসব আসনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য জয় পরাজয়ে রূপান্তর করা হয়েছে।

কৌশলগত লক্ষ্য : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল : ক্লোজ কনটেস্ট আসনে ফলাফলের দিক পরিবর্তন; বিরোধী দলকে ৫০-৬০ আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং পরবর্তীতে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের দিনে নির্বাচনী পরিবেশের মধ্যে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে গণনা ও ব্যালট ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা হয়েছে।

যাচাই ও পর্যালোচনা : নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব আসনে ব্যবধান কম, সেই ব্যালটগুলো পুনঃপরীক্ষা বা পুনর্গণনা করলে অনেক অভিযোগ স্পষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কোনো অফিসিয়াল রিপোর্ট বা স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগের প্রমাণ যাচাই করেননি।

একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘যদিও অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রমাণ ছাড়া তা আদালতে বা কমিশনে গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে কম ব্যবধানের আসনগুলোতে পুনর্গণনার দাবি উঠতে পারে।’

সামনে কী?

জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে আপাতত তাৎক্ষণিক আন্দোলনের পরিবর্তে ফল বিশ্লেষণ ও সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। পুনর্গণনা বা অডিটের মাধ্যমে ব্যালট যাচাই করা হলে, কিছু ক্লোজ কনটেস্ট আসনে প্রকৃত ফলাফলের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে স্থানীয় নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংগঠন শক্তিশালী করার লক্ষ্য এখন দলটির অগ্রাধিকার হতে পারে।

অভিযোগে কী বলা হচ্ছে?

পিরোজপুর-২ : প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী মাত্র ৭০ ভোটে পরাজিত : খুলনা-৫ : মিয়া গোলাম পরোয়ারকে প্রায় ২,০০০ ভোট ব্যবধানে হারানো। মোট ৫৩টি আসন এমন রয়েছে যেখানে ভোট ব্যবধান ৫০০০-এর কমে জামায়াত-জোটের পরাজয় হয়েছে।

দলের একটি সূত্র দাবি করেছেন, ‘জামায়াত-জোট প্রকৃতপক্ষে ১৩৫টি আসনে জয়ী হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক প্রভাব ও ডিপ স্টেটের হস্তক্ষেপের কারণে সংখ্যা ৭০-৮০ আসনে সীমিত দেখানো হয়েছে।’

একই সূত্রে আরো বলা হয়, নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত কর্মকর্তা ও কর্মীরা নির্বাচনের দিন কিছু কেন্দ্রে অতিরিক্ত ব্যালট ছাপিয়ে তা কেন্দ্রের গোপন কক্ষে প্রেরণ করেন। উল্লেখযোগ্য আসনে যেমন ঢাকা-১৩, খুলনা-৫, এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। জামায়াত-সমর্থিত কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ করেন, ভোটগ্রহণের সময় পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও গণনার সময় এজেন্টদের বের করে দেয়া, ফল ঘোষণায় বিলম্ব এবং রাতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দিনে ভোট ভালোই হয়েছে। কিন্তু রাতের কাউন্টিং টেবিলে আমরা ছিলাম না। তখনই ফল ঘুরে যায়।’ তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো লিখিত বা আদালত-স্বীকৃত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

গণনার সময় ‘ব্ল্যাকআউট’?

একাধিক কেন্দ্রের এজেন্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সন্ধ্যার পর ভোটকেন্দ্রের বাইরে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি কমিয়ে দেয়া হয়। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ভিড় সরিয়ে দেয়। ফলে গণনা প্রক্রিয়া জনসম্মুখে না হয়ে সীমিত পর্যবেক্ষণে সম্পন্ন হয়। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুনর্গণনা বা অডিটই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে জোরালো হলেও প্রমাণ ছাড়া তা টিকবে না।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা জানতে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ‘সব কেন্দ্রে নিয়ম মেনেই গণনা হয়েছে’ -তবে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে পৃথক তদন্তের কথা বলেনি।

তাহলে আন্দোলন নয় কেন?

রাজনৈতিক মহলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়-দলটি তাৎক্ষণিকভাবে রাজপথে নামছে না কেন? দলীয় ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, নেতৃত্বের ভেতরে তিনটি কৌশলগত বিবেচনা কাজ করছে :

১. সঙ্ঘাত এড়ানো : বড় ধরনের আন্দোলনে প্রশাসনিক কঠোরতা ও সাংগঠনিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

২. সাংগঠনিক পুনর্গঠন : দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর দলটি এখন তৃণমূল পুনর্গঠনে সময় দিতে চায়।

৩. স্থানীয় নির্বাচন লক্ষ্য : আগামী সিটি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শক্ত অবস্থান নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘রাজনীতি ম্যারাথন, স্প্রিন্ট নয়। এখন শক্তি সঞ্চয়ের সময়।’

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে- নির্বাচন বিশ্লেষক ও গবেষকদের মতে, অল্প ব্যবধানে পরাজিত আসনগুলোতে তিনটি বিষয় যাচাই জরুরি : ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ফলের অসামঞ্জস্য; বাতিল ভোটের সংখ্যা; গণনা প্রক্রিয়ায় এজেন্ট উপস্থিতি।

তারা বলছেন, যদি সত্যিই ৫০টির বেশি আসনে ব্যবধান এত কম হয়, তাহলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিট বা রিকাউন্টের আওতায় আনা উচিত ছিল।

তবে একই সাথে তারা মনে করিয়ে দেন, বড় দলগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আন্দোলন’ নয়, ‘সমঝোতা ও প্রস্তুতি’কেই বেছে নেয়।

কৌশল না দুর্বলতা?

প্রশ্ন এখন দুই ধরনের ব্যাখ্যায় দাঁড়িয়েছে- প্রথমত, কৌশলগত ধৈর্য মানে- সঙ্ঘাত এড়িয়ে সংগঠন শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা মানে মাঠে সমর্থন কম, তাই আন্দোলনের ঝুঁকি না নেয়া। এর মধ্যে সঠিক তা সময়ই বলে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সামনে কী?

দলটির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তারা নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহ করছে; বিতর্কিত আসনের ডাটা বিশ্লেষণ করছে; স্থানীয় নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে; অন্য দিকে নাগরিক সমাজের দাবি, ফলাফল নিয়ে সন্দেহ থাকলে স্বচ্ছ তদন্ত বা পুনর্গণনাই আস্থার একমাত্র পথ। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে জোরালো হলেও তা এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে কম ব্যবধানের এতগুলো আসন এবং গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন-এই নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত রাখতে পারেনি। এই মুহূর্তে স্পষ্ট যে- জামায়াত মুখোমুখি সঙ্ঘাতের বদলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলেই হাঁটছে। সেটি তাদের জন্য লাভজনক হবে, নাকি রাজনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া করবে-তা নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী লড়াইয়ের ওপর।