ক্রীড়া প্রতিবেদক
পাওয়ার-গতি বা নান্দনিক ফুটবলের কোনোটাই ছিল না প্যারাগুয়ে ও ফ্রান্স ম্যাচে। তারপরও শেষ ষোলোর লড়াইয়ে দুই মহাদেশের দুই দলের লড়াইয়ে উত্তেজনার কমতি ছিল না। একের পর এক কঠিন ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি, তর্কবিতর্ক আর একে অপরের দিকে তেড়ে যাওয়া মিলে পুরো ম্যাচজুড়েই ছিল উত্তাপ। সেই উত্তপ্ত ছাপিয়ে শেষ হাসি হাসল ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নরা। প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ আটে জায়গা নিশ্চিত করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক কৌশল ছিল প্যারাগুয়ের। ম্যাচ শুরুর ১০ মিনিটে প্রায় ৯০ শতাংশ সময় বলের দখল রেখে এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেদের একের পর এক আক্রমণ বারবার আটকে গেছে পাঁচ ডিফেন্ডারের গড়া প্যারাগুয়ের রক্ষণে। প্রথম ২০ মিনিটে কোনো শটই লক্ষ্যে রাখতে পারেননি ফরাসিরা। গোছানো ফুটবল না হলেও ম্যাচের ৩৫ মিনিটে ভিন্ন এক ঘটনায় প্রথম বড় উত্তেজনা দেখা দেয়। আন্দ্রেস কুবাসের ট্যাকলে এমবাপ্পে মাটিতে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়েরা ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন। রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ পরিস্থিতি সামাল দেন সে যাত্রায়। প্রথমার্ধে কোনো দলই লক্ষ্যে শট রাখতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি মাত্র তৃতীয় ম্যাচ, যেখানে বিরতির আগে কোনো দলই অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি।
বিরতির পর আক্রমণের ধার বাড়ায় ফ্রান্স। দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে ম্যাচের। একটু ওপরে ওঠে খেলার চেষ্টা করতে থাকে প্যারাগুয়ে। তাতে আক্রমণের জায়গাও তৈরি হয় ফ্রান্সের সামনে। পরপর দুই মিনিটে দারুণ দু’টি সুযোগও পায় তারা। ৫২ মিনিটে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মাঝমাঠে উঠে আসতে দেখে গোলরক্ষক মাইক ম্যাগনান বল ধরে লম্বা করে বল বাড়ান এমবাপ্পের উদ্দেশে। ক্ষিপ্র গতিতে সবাইকে পেছনে ফেলে ছুটে গিয়ে ফরাসি ফরোয়ার্ড শট নেয়ার আগেই ক্লিয়ার করেন ডিফেন্ডার কাসেরেস। এরপর ডি-বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শট নেন কোনে। এবার বল লক্ষ্যে থাকলেও দারুণ নৈপুণ্যে এক হাত দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল।
ম্যাচের ৭০ মিনিটে সফল স্পট কিকে ডেডলক ভাঙেন এমবাপ্পে। ৬১ মিনিটে বদলি নামা দেজিরে দুয়ে দারুণ নৈপুণ্যে বক্সে ঢুকে পড়লে পেছন থেকে ফেলে দেন দিয়েগো গোমেজ। ফাউলের শিকার হলেও প্রথমে খেয়াল করেননি রেফারি। বেশ কিছুক্ষণ পর ভিএআরের পরামর্শে সাইড মনিটরে দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টান রেফারি। প্রতিবাদ চলতে থাকে প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের। ডাগআউটে দলটির কোচ ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করেন, ডাইভ দিয়েছে দুয়ে। এমনকি হাইড্রেশন ব্রেকের সময়ও এমবাপ্পের কাছে গিয়ে প্যারাগুয়ের একজন কিছু একটা বলেন, তাতেও সামান্য উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সফল স্পট কিকে বল জালে পাঠিয়ে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আবারো শীর্ষে উঠলেন এমবাপ্পে। এ নিয়ে সাতটি গোল ও দু’টি অ্যাসিস্ট ফরাসি ফরোয়ার্ডের। একই সাথে টানা তিন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় গোল করার কীর্তিও গড়লেন ফরাসি তারকা। চলমান বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সমান সাতটি গোল করেছেন লিওনেল মেসিও। আর বিশ্বকাপে মোট ১৯টি গোল হলো এমবাপ্পের। এক গোল বেশি নিয়ে তালিকার চূড়ায় আছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ওই গোলের পরও কিছুক্ষণ মাঠের খেলায় উত্তাপ বজায় থাকে। অহেতুক কিছু কড়া ফাউলেরও দেখা মেলে। নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট বাকি থাকতে আবার ভীতি ছড়ান এমবাপ্পে। রায়ান শেরকির পাস ধরে রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ডের জোরাল শট ঝাঁপিয়ে রুখে দেন গোলরক্ষক। ১০ মিনিট যোগ করা সময়ে আরো দু’টি দারুণ সুযোগ পান এমবাপ্পে। ডি-বক্সের মুখ থেকে তার জোরাল শট ঝাঁপিয়ে আটকানোর পর ফিরতি বলে তার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও রুখে দেন গিল। শেষ পর্যন্ত ওই এক গোলকে পুঁজি করে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স।
সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ইউরোপের দেশটির প্রতিপক্ষ এবার আফ্রিকার দেশ। মরক্কোকে হারিয়েই গত আসরে ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। শেষ চারে ওঠার লড়াইয়ে এবার এক দিকে ২০২২ আসরের প্রতিশোধ মরক্কোর সামনে। অন্য দিকে আবার এগিয়ে যাওয়ার পালা ফ্রান্সের।



