বন্দী বিদ্রোহের চেষ্টা ও স্পর্শকাতর তথ্য পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য

কারারক্ষী ছামিউলের বেপরোয়া রাজত্ব

Printed Edition

রংপুর ব্যুরো

রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সদ্য সাবেক প্রধান কারারক্ষী ছামিউল ইসলামের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য এখন কেন্দ্রীয় প্রিজন্স কর্মকর্তাদের টেবিলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং জুলাই বিপ্লবের সময় বন্দী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়া, রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য পাচার, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘জামাই আদর’ এবং কারাগারকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি তাকে রংপুর থেকে পঞ্চগড় কারাগারে প্রশাসনিক বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও কারা কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।

তদন্ত ও কারাসূত্র মতে, ২০০২ সালে বগুড়া কারাগারে কারারক্ষী হিসেবে যোগ দেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ছামিউল ইসলাম। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০১১ সালেই প্রধান কারারক্ষীর পদ বাগিয়ে নেন তিনি। দীর্ঘ ২৪ বছরের চাকরি জীবনে ছামিউলের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলা ও অপরাধের খতিয়ান দীর্ঘ। বিভিন্ন অভিযোগে তিনি দু’বার প্রশাসনিক বদলি, তিনবার সাময়িক বরখাস্ত এবং সাতবার সতর্ক নোটিশ পেয়েছেন।

বিগত সময়ে বগুড়া, রাজশাহী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও নীলফামারী ঘুরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি রংপুরে যোগ দেন। ২০০৮ সালে রাজশাহীতে এক সেনাকর্মকর্তার স্ত্রীর সাথে অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত হন এবং ২০১৯ সালে পঞ্চগড়ে এক বন্দীর আত্মহত্যার ঘটনায় আবারো বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হন। তবে প্রতিবারই ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় পার পেয়ে যান তিনি। অনুসন্ধানে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবের আগে কারাবন্দী তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন ছামিউল। অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগী রাজবন্দী জানান, ছামিউলের সিন্ডিকেটকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা না দিলে কপালে জুটতো অমানুষিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

বিপরীতে, জুলাই বিপ্লবের পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রংপুর মহানগর সভাপতি তুষার কান্তি মন্ডল ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সিরাজুম মুনির বাশারসহ বড় নেতাদের ‘জামাই আদরে’ রাখতেন ছামিউল। কারাগারের ভেতরেই তাদের বিশেষ সাংগঠনিক সুবিধা দেয়া হতো। এমনকি কারাগার থেকে ছামিউলের মাধ্যমেই বাইরে আওয়ামী লীগের ফেসবুক অ্যাক্টিভিটি ও ঝটিকা মিছিলের রুট এবং দিকনির্দেশনা পাঠানো হতো বলে গোয়েন্দারা প্রমাণ পেয়েছেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবের সময় রংপুর কারাগারে বন্দীদের বের করে দেয়ার লক্ষ্যে একটি বড় বিদ্রোহের ছক এঁকেছিলেন ছামিউল, যার পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ছিল। এর আগে চলতি বছরের ঈদুল আজহার সময় ডিউটি সংক্রান্ত অজুহাতে সিসিটিভি ক্যামেরার তোয়াক্কা না করে কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করতে ‘মব’ তৈরি করেন তিনি। এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হবে না’- এমন প্রচারণা চালিয়ে বন্দীদের সঙ্ঘবদ্ধ করার নেপথ্য কারিগর ছিলেন এই ছামিউল। কারাগারের অতি গোপনীয় ও স্পর্শকাতর সরকারি সিদ্ধান্ত ও নথিপত্র তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা নেতাদের কাছে পাচার করতেন।

আয়ের অন্যতম উৎস ছিল বহুমুখী বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, কোর্টের মুহুরি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কার জামিন হচ্ছে তা আগেভাগে জেনে যেতেন ছামিউল। এরপর বন্দীকে ডিবি পুলিশের পুনঃগ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা চুক্তি করতেন। টাকা না দিলে সত্যিই ডিবিকে তথ্য দিয়ে জেলগেট থেকে গ্রেফতার করানো হতো।

মোবাইল ও চিকিৎসা বাণিজ্য : কারাগারে সচ্ছল বন্দীদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে প্রকাশ্যে মোবাইল সুবিধা দিতেন। নিজের বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা এনে প্রতি ১০০ টাকায় ১০ টাকা কেটে রাখতেন। এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে বন্দীদের বাইরে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

মাদক সাপ্লাই : কারাগারের চিহ্নিত শীর্ষ মাদকাসক্ত ও প্রভাবশালী বন্দীদের সরাসরি মাদক সরবরাহ করতেন ছামিউল। প্রধান কারারক্ষী হওয়ায় গেটের কর্মীরা তাকে তল্লাশি করতে পারত না, এই সুযোগটিই তিনি নিতেন। গত জুনে তার এই মাদক ও মোবাইল বাণিজ্যের প্রতিবাদ করায় চার বন্দীকে দিয়ে অন্য কারারক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। পরবর্তীতে ওই চার বন্দীকে দিনাজপুর ও পঞ্চগড় কারাগারে বদলি করা হয়।

নিয়োগ বাণিজ্য : কারারক্ষী নিয়োগে আট থেকে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করতেন ছামিউল। রংপুর সদরের এক সাবেক যুব মহিলা লীগ নেত্রী ও ইউপি সদস্য তার মাধ্যমে ৯ লাখ টাকা দিয়ে নিয়োগ পেতে ব্যর্থ হন। পরে ৭০ ভাগ টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা ছামিউল আত্মসাৎ করেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থা

গত ১৮ জুন রংপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার এ এস এম কামরুল হুদা বিভাগীয় ডিআইজির কাছে ছামিউলের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের লিখিত অভিযোগ এনে দূরবর্তী কারাগারে বদলির আবেদন করেন।

রংপুর বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) কামাল হোসেন জানান, ‘প্রধান কারারক্ষী ছামিউলের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ও নির্বাচনের আগে কারা বিদ্রোহের চেষ্টা এবং মব তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। কারা প্রশাসন সচল রাখতে তাকে পঞ্চগড়ে বদলি করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তার দু’টি মোবাইলফোন জব্দ করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের জন্য কারা মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

বর্তমানে ছামিউলের ফোন জব্দ থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে তার পরিবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।