ব্রিতে দুর্নীতির অভিযোগের দীর্ঘ ছায়া ভেতরে চলছে ‘প্যারালাল প্রশাসন’!

Printed Edition

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) দীর্ঘদিন ধরে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি, নিয়োগে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। এ কারণে দেশের অন্যতম এই শীর্ষ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিগত দেড় দশকে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ পদ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে গবেষণার পরিবেশকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক মহাপরিচালক ড. মো: শাহজাহান কবীরের আমলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়াই আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে একাধিক কর্মকর্তা পদোন্নতি ও নিয়োগ পান। সে সময় কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগে নিয়াজ ফারহাতকে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার (এসএসও) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে পিএইচডি ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তাকে প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার (পিএসও) পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এ বিষয়ে অভিযোগ ওঠার পর একটি তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাকে দায়মুক্ত করার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। একই সময়ে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগে পদ না থাকা সত্ত্বেও ড. আশিক ইকবালকে প্রশিক্ষণ বিভাগের একটি পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

এ ছাড়া, প্রকল্প অনুমোদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পিপিও মনিরুল ইসলাম ও ড. আব্দুল কাদের এ ধরনের সুবিধা পেয়েছিলেন।

এ ছাড়া ড. দুররুল হুদাকে ব্রির প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর অবকাঠামো নির্মাণ, ভবন, সড়ক, গেট, ড্রেন এবং যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কাজের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এ দিকে পদ না থাকা সত্ত্বেও আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ড. হুমায়ুন কবীর, ড. আমিনুল ইসলাম, ড. দুররুল হুদা ও ড. আব্দুল কাদের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার (সিএসও) পদে পদোন্নতি নেন। অভিযোগ রয়েছে, কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পদে পদোন্নতি পেলেও ড. দুররুল হুদা কখনো সেখানে যোগদান করেননি। ডেপুটি ডিরেক্টর গোলাম রশিদের বিরুদ্ধেও দেশী-বিদেশী প্রকল্প থেকে কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই টাকায় তিনি রাজধানীতে ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হলেও তার বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে ব্রির সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক, বিদ্যালয় ভবন এবং মহাপরিচালকের বাংলো বারবার সংস্কারের নামে অর্থ অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। অভিযোগে বলা হয়, আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এ দিকে কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে ড. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে পুকুর খনন ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদের মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

আরো অভিযোগ রয়েছে, ব্রি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা ভবনের চারতলার নির্মাণকাজ যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই শুরু করা হয়েছিল। এ ছাড়া সিনিয়র বিজ্ঞানীদের ডিঙিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সিএসও পদে পদোন্নতি দেয়ায় বহু যোগ্য বিজ্ঞানীর পদোন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যায়।

নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের একটি প্রকল্পে কর্মরত মারুফা পপির কাছ থেকে চাকরি দেয়ার নামে কয়েক ধাপে অর্থ দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দাবিকৃত পুরো অর্থ না দেয়ায় মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও তার নাম চূড়ান্ত ফলাফল থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং গাজীপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন। ওই ঘটনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে নিয়োগ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বর্তমানে ব্রির ভেতরে কার্যত একটি ‘প্যারালাল প্রশাসন’ গড়ে উঠেছে। রাতে গোপনে ভাইভা বোর্ড পরিচালনা করে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগও রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

এ দিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক নেতা অভিযোগ করেন, চাকরির বয়সসীমা শেষ হয়ে যাওয়া কয়েকজন শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ পরিবর্তন করে তাদের আবার চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়েও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রমিক মো: আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। গত বছরের অক্টোবরে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: শহিদুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকেও নির্মাণকাজে প্রভাব বিস্তার, সরকারি কক্ষ দখল এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণসহ নানা অনিয়মে জড়িত।

অন্য দিকে গত তিন বছরে ব্রিতে এক ডজনেরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন তদন্তে অনিয়মের তথ্য উঠে এলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, বিতর্কিত পদোন্নতি ও নিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে দেশের কৃষি গবেষণার অন্যতম প্রধান এই প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা ও গবেষণার মান আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পদোন্নতি, নিয়োগ, প্রকল্প পরিচালনা ও দায়িত্ব বণ্টন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে তারা দাবি করেন। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগের কোনো সত্যতা মিলবে না বলেও তাদের দাবি।