এক হতে যাওয়া ৫ ব্যাংকের গ্রাহকরা চরম বিপাকে

ন্যূনতম অর্থও উত্তোলন করতে পারছে না কেউ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে পুনর্গঠিত হতে যাওয়া ৫ ব্যাংকের গ্রাহকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। তারা ব্যাংকগুলো থেকে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ন্যূনতম অর্থও উত্তোলন করতে পারছে না। নগদ টাকার সঙ্কট থাকায় আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী কোনো অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংকের শাখাগুলোর ম্যানেজাররাও নিরূপায়। গ্রাহক টাকা উত্তোলনের জন্য পে-অর্ডার বা চেক জমা দিলেও এর বিপরীতে ব্যাংক কোনো অর্থ দিতে পারছেন না। এর ফলে গ্রাহক আতঙ্ক আরো বেড়ে যাচ্ছে।

বিদেশী একটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার নিকটাত্মীয়া এক্সিম ব্যাংকের রাজধানীর ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোড শাখার গ্রাহক। তার এক্সিম ব্যাংকের দুই লাখ টাকার একটি পে-অর্ডার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে নগদায়ন করতে দিয়েছিলেন। কিন্তু পর পর দু’দিন এক্সিম ব্যাংকের শাখা থেকে ক্লিয়ারিং করেনি। তিনি গতকাল তার ওই নিকটাত্মীয়ার পে-অর্ডার নগদায়ন না হওয়ার কারণ জানতে এক্সিম ব্যাংকের সাত মসজিদ রোড শাখায় গিয়েছিলেন। শাখা ব্যবস্থাপক তাকে জানিয়ে দেন, শাখায় কোনো টাকা নেই। ওই সময় অন্য গ্রাহকরাও টাকা উত্তোলনের জন্য শাখা ব্যবস্থাপকের রুমে বসেছিলেন। সবাইকে একই কথা জানিয়ে দেন। দেশের জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক কোটি টাকার একটি এফডিআর আছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে। আগে ওই এফডিআরের মুনাফা দিয়ে প্রেস ক্লাবের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো হতো। কিন্তু গত এক বছরে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক উক্ত এফডিআরের বিপরীতে কোনো মুনাফাও যোগ করেনি। এখন জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ রক্ষিত এফডিআরের বিপরীতে কোনো মুনাফা পাচ্ছেন না। এতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। বনশ্রীর বাসিন্দা মানিক হোসেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে আমানত রেখেছিলেন। আপদকালীন ব্যয় মেটানোর জন্য এ অর্থ মজুদ করেছিলেন। তার পারিবারিক প্রয়োজনে টাকা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এখন এক টাকাও ফেরত দিতে পারছে না। কিছুদিন দিনে একবার পাঁচ হাজার টাকা করে উত্তোলন করতে পারতেন। এখন এক টাকাও উত্তোলন করতে পারছেন না। এ বিষয়ে শাখা ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, শাখায় কোনো টাকা নেই। টাকা আসলে দেয়া যাবে। লোকমান হোসেন নামক একজন গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাতে বড় বোন কিছু টাকা দিয়েছিলেন। লোকমান হোসেন বেশি মুনাফার আশায় ইউনিয়ন ব্যাংকে আমানত রেখেছিলেন। তার পরিবারিক প্রয়োজনে টাকা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে আমানতের এক টাকাও উত্তোলন করতে পারছেন না। এখন তিনি চরম বিপদের মধ্যে আছেন। বিষয়টি তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডিকে পর্যন্ত জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও কোনো সমাধান দিতে পারেননি।

তেমনিভাবে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকও গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা চরম বিপাকে পড়ে গেছেন। নিজের জমানো অর্থ প্রয়োজনের সময় উত্তোলন করতে না পারায় অনেকের মধ্যেই অনিশ্চয়তা ভর করেছে টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে। ব্যাংকগুলোর এ অবস্থা বেশ কয়েক মাস যাবৎ চলছে। কিন্তু কোনো সমাধান হচ্ছে না। কবে এ সমস্যার সমাধান হবে তারও কোনো উত্তর নেই ব্যাংকারদের কাছে।

ব্যাংকগুলোর কেন এই অবস্থা : পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের বড় অংশ ছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। আলোচ্য ৫ ব্যাংকের মধ্যে চারটিই দখল করেছিল ব্যাংক ডাকাত মাফিফা এস আলম। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দখলে ছিল এস আলমের। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো থেকে জনগণের আমানতের বেশির ভাগ অংশই লুটে নেয় এস আলম। অপর দিকে, পতিত প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম অর্থের জোগানদাতা নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘ দেড় যুগ এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ দখলে রাখেন। মতের বিপরীতে পরিচালকদের নানা কৌশলে বের করে দেন। মূলত তার কয়েকজন সিপাহসালার নিয়ে একাই চালাতেন মজুমদার। সাধারণের আমানতের অর্থও তিনি নানা কৌশলে ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে বের করে নেন। তবে এস আলম ও মজুমদারের এ ব্যাংক লুটপাটের তথ্য কোনোভাবেই প্রকাশ করতে দেয়া হতো না। খেলাপি ঋণ দেখানো হতো দুই থেকে আড়াই শতাংশ, যেখানে কোনো কোনোটির ৯৮ শতাংশ অর্থই হাওয়া হয়ে গেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর আন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হওয়ার পরপরই ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙ্গে দেয়া হয়। নতুনভাবে পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরপরই ব্যাংকগুলোর লুটপাটের প্রকৃত তথ্য বের হতে থাকে। দেখা যায়, ব্যাংকগুলো অনেকটাই ফাঁপা হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল জোগান : পর্ষদ পুনর্গঠনের পরপরই ব্যাংকগুলোতে কয়েক স্তরের নিরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, ব্যাংকগুলোতে জনগণের আমানতের বড় অংশই লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের প্রায় ৪৮ শতাংশ অর্থ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এতে ব্যাংকগুলোতে প্রচণ্ড টাকার সঙ্কট দেখা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকের চাপ সামলাতে নগদ টাকা ছেপে টাকার জোগান দিতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে বন্ডসহ প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা, ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ও ইউনিয়ন ব্যাংককে গড়ে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার জোগান দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর পরও ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ ছিল সাধারণ গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর জন্য অর্থ দেয়া হলেও ব্যাংক লুটেরা বেনামী ডিপোজিট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বড় একটি অংশ উত্তোলন করে নিয়ে গেছে। এর সাথে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একীভূত করার ঘোষণা : বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, ৫ ব্যাংক মিলে নতুন নামে একটি বড় ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হবে। একীভূত করার ঘোষণা বারবারই দেয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ঘোষণা করেছিলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যাংকগুলোর একীভূত করার কাজ শুরু হবে। এক সপ্তাহও বিগত হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো একীভূত করতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার তহবিল প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে আগামী এক মাসের মধ্যেই একীভূত করার কাজ শুরু করা যাবে।

আপদকালীন সঙ্কট মেটাতে তহবিল চাওয়া হচ্ছে : এদিকে ব্যাংকগুলোতে কেউ নতুন করে আমানত রাখছে না। সবাই শুধু উত্তোলন করতে চাচ্ছেন। এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকার ও গ্রাহক উভয়ই বেকায়দায় পড়ে গেছেন। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে পরপর দুই দিন বৈঠক করে ৫ ব্যাংকের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা নতুন করে তহবিল জোগান দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি তা নাকচ করে দেয়া হয়। ফলে সাধারণ আমানতকারীর কী হবে এ বিষয়ে কোনো সমাধান করা হচ্ছে না। এখন অপেক্ষার পালা, কবে একীভূত হয় তার দিকে।