- গবেষণা বাজেটের বড় অংশ অব্যবহৃত
- নিষ্ক্রিয় গবেষণা কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ
- প্রতিবেদন না জমার প্রবণতা বাড়ছে
একটি দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কাজ হলো গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল ভিত্তি গবেষণা; কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো গবেষণার ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়; বরং গবেষণার জন্য বরাদ্দ পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ প্রতি বছর অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে, যা গবেষণা ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অফিস থেকে জানা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গবেষণা খাতে মোট ২০ কোটি সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থই ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। তা সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে। গত পাঁচ বছরে গবেষণা খাতে মোট ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। ফলে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা অব্যবহৃত থেকে যায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫ কোটি পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ হলো ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ছিল এবং ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় করা সম্ভব হয়েছিল মাত্র তিন কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।
এ দিকে গবেষণা কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও ভালো নয় এসব কেন্দ্রের অনেকগুলোই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। গত পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রের জন্য মোট ৩৮ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ১১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা অব্যবহৃত থেকে গেছে। শতকরা হিসাবে যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসাইন বলেন, অনেক গবেষণা কেন্দ্র বছরের পর বছর ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবুও নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ রাখা হয়। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা ৮ থেকে ১০টি গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তার মতে, নিষ্ক্রিয় কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা গেলে গবেষণা তহবিল আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি প্রকৃত গবেষক ও সক্রিয় গবেষণা প্রকল্পগুলো বেশি অর্থায়নের সুযোগ পাবে। তিনি আরো জানান, গবেষণা খাতে অব্যবহৃত থেকে যাওয়া অর্থ শেষ পর্যন্ত সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমে অর্থায়নের আরেকটি উৎস হলো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসির অর্থায়নে ৯২টি গবেষণা প্রকল্পের জন্য ছয় কোটি ৩৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছিল। একই অর্থবছরের দ্বিতীয় ধাপে আরো ৫১টি গবেষণা প্রকল্পের জন্য তিন কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৫টি গবেষণা প্রকল্পের জন্য দুই কোটি ৪৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।
এ দিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ইউজিসির অর্থায়নে ৯৮টি গবেষণা প্রকল্পের অনুকূলে ৯ কোটি ৯২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কলা অনুষদের ১৩টি প্রকল্পের জন্য এক কোটি ১১ লাখ ১৭ হাজার টাকা, বিজ্ঞান অনুষদের ১৮টি প্রকল্পের জন্য এক কোটি ৬৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের সাতটি প্রকল্পের জন্য ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের আটটি প্রকল্পের জন্য ৯৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা এবং জীববিজ্ঞান অনুষদের ১৬টি প্রকল্পের জন্য এক কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফার্মেসি অনুষদের ছয়টি প্রকল্পের জন্য ৫৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের ৯টি প্রকল্পের জন্য এক কোটি দুই লাখ ৮২ হাজার টাকা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ১০টি প্রকল্পের জন্য এক কোটি ১৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের প্রকল্পগুলোর জন্যও পৃথকভাবে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
গবেষণাপত্র সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের আন্তর্জাতিক ডেটাবেস স্কোপাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, এসব গবেষণার মান, মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরেকটি সমস্যা হলো গবেষণা প্রতিবেদন জমা না দেয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ইউজিসির অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দেয়ার কিন্তু অনেক শিক্ষক তা করছেন না। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৫ জন প্রতিবেদন জমা দিলেও ২১ জন এখনো দেননি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৫ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৩৮ জন প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। বাকি ৩৭ জন এখনো প্রতিবেদন জমা দেননি।
গবেষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই অনুদানের স্বল্পতার কারণে গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তাদের মতে, গবেষণার জন্য যে অর্থ দেয়া হয় তা দিয়ে একটি মানসম্পন্ন গবেষণা সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গবেষক বলেন, গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও দেয়া হয় না। আবার যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তারও বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। ফলে গবেষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অবকাঠামো এখনো দুর্বল। আন্তর্জাতিক মানের একটি গবেষণা পরিচালনা করতে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা প্রয়োজন, সেখানে অনেক গবেষক পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা অনুদান পাচ্ছেন। ফলে গবেষণার মান উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, গবেষণার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষক গবেষণা অনুদানের জন্য আবেদন করেন; কিন্তু সবার আবেদন মঞ্জুর করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ আট থেকে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান পান। এই অর্থ দিয়ে বিশেষ করে সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, শিক্ষা কিংবা নীতিনির্ধারণমূলক গবেষণা পরিচালনা করা বেশ কঠিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, গবেষণা খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় খুবই কম।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পরিবেশ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্থায়ী গবেষণা তহবিল গঠন ছাড়া এই খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।
গবেষণা খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা, কার্যকর অর্থায়ন এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতে গবেষণার ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



