জটিল সমীকরণের ফাঁদে অভিন্ন নদীর পানি চুক্তি

এই সঙ্কটের সমাধান কেবল কারিগরি আলোচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ পানিবণ্টন শুধু হাইড্রোলজিক্যাল হিসাব নয়-এটি ক্ষমতা, আঞ্চলিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন।

আবুল কালাম
Printed Edition
জটিল সমীকরণের ফাঁদে  অভিন্ন নদীর পানি চুক্তি
জটিল সমীকরণের ফাঁদে অভিন্ন নদীর পানি চুক্তি

  • রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া অচলাবস্থা কাটার নয়
  • ব্যর্থতার দায় কূটনীতির, বাড়ছে সঙ্কটের ঝুঁকি

বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন চুক্তি আজ প্রায় সাত দশক ধরে জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণের ফাঁদে আটকে আছে। স্বাধীনতার পর একাধিক সরকার ক্ষমতায় এলেও- জাতীয় পার্টি, বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ- কেউই ভারতের সাথে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ থাকা সত্ত্বেও এই সঙ্কটের কার্যকর সমাধান আনতে পারেনি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারও বিষয়টিকে অগ্রাধিকারে আনতে সক্ষম হয়নি। ফলে সময় যত যাচ্ছে, সঙ্কট ততই জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, নদী-নির্ভর জীবিকা ও পরিবেশ ভারসাম্যের ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সঙ্কটের সমাধান কেবল কারিগরি আলোচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ পানিবণ্টন শুধু হাইড্রোলজিক্যাল হিসাব নয়-এটি ক্ষমতা, আঞ্চলিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন।

রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া অচলাবস্থা ভাঙবে না

পানি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সঙ্কটের সমাধান কেবল কারিগরি আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ। কারণ পানির প্রশ্নটি দুই দেশের সার্বভৌম স্বার্থ, খাদ্য নিরাপত্তা, সীমান্ত রাজনীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সাথে সরাসরি যুক্ত। উজানে পানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভারতের হাতে থাকায় আলোচনায় শক্তির ভারসাম্য একতরফা হয়ে পড়ে, যা সমঝোতাকে আরো কঠিন করে তোলে।

বিগত সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও তিস্তা কিংবা অন্যান্য অভিন্ন নদীর চুক্তিতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্পষ্ট জাতীয় কৌশল, দক্ষ নেগোসিয়েশন টিম এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক রোডম্যাপ। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা, আমলানির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলায় দুর্বলতা এই অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে এই সঙ্কট আরো গভীর হবে। সময়মতো রাজনৈতিক উদ্যোগ না নিলে পানি ইস্যু কেবল কূটনৈতিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য মূল্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

যৌথ নদী কমিশনের সীমাবদ্ধতা ও ধীরগতি

বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) বিষয়টি নিয়ে কার্যক্রম চালালেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। ডাটা শেয়ারিং, কারিগরি যাচাই, নদীর প্রবাহ বিশ্লেষণ- সব মিলিয়ে প্রতিটি ধাপ সময়সাপেক্ষ।

জেআরসির পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে যেকোনো পানি চুক্তিতে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন, যা ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হবে। এ নিয়ে কাজ চলছে।’

তিনি জানান, ইতোমধ্যে ছয়টি নদীর কারিগরি তথ্য ভারতের সাথে আদান-প্রদান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো নদীর তথ্য শেয়ার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আবু সাঈদ উল্লেখ করেন, আমাদের সাথে ভারতের প্রায় ৫৪ থেকে ৫৭টি অভিন্ন নদী রয়েছে। ধাপে ধাপে এগুলো নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কুশিয়ারার বিষয়ে ২০২২ সালে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যা এখন বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে।

তবে তিনি স্বীকার করেন, এই কাজগুলো অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। লেগে থাকলে একসময় হয়তো আলোর মুখ দেখবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান : বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা

সরকারের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সামলাতেই অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়েছে।

সূত্রটির ভাষ্য, ৫০ বছরে রাজনৈতিক সরকারগুলো যেখানে সমাধান করতে পারেনি, সেখানে এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার সমাধান করবে- এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সরকার বিষয়টি নিয়ে বড় কোনো প্রক্রিয়ায় যায়নি।

এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, পানি কূটনীতিতে কাঠামোগত অগ্রাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের ঘাটতি রয়ে গেছে।

ড. আইনুন নিশাত : এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সঙ্কট

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, এই সঙ্কটের মূল দায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার। তিনি বলেন, ১৯৫১ সাল থেকে এই আলোচনা চলছে। প্রায় ৭৫ বছর হয়ে গেল, কিন্তু সমাধান হয়নি। সামনে জটিলতা আরো বাড়বে।

তার মতে, পানির বিষয়টি শতভাগ রাজনৈতিক। কারিগরি দিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া সম্ভব নয়। এখন দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে পানির বিষয়েও জটিলতা বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন সমাধান হয়নি- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি সিরিয়াসলি নেয়া হয়নি। এটা কূটনৈতিক ব্যর্থতা।

তিনি আরো মন্তব্য করেন, আমাদের রাজনীতিবিদদের নেগোসিয়েশন দক্ষতার ঘাটতি আছে। শুধু আমলাদের ওপর নির্ভর করলে এমন জটিল ইস্যুতে সফলতা আসে না।

সমাধানের পথ সম্পর্কে তার স্পষ্ট বক্তব্য, রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নত না হলে কোনো অগ্রগতি হবে না। এটি অঙ্কের সমাধান নয়, এটি রাজনীতির সমাধান। ব্যর্থ হলে ভারত পানি আটকে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তব চিত্র

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়-

১৯৫৩ সালে তৎকালীন ভারত- পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম তিস্তা পানি বণ্টন আলোচনা শুরু।

প্রায় ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে।

ফেনী নদীর পানি বণ্টনে প্রায় ২০ বছর আলোচনার পর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাস্তবে প্রায় ১২৩টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

সরকারিভাবে স্বীকৃত অভিন্ন নদীর সংখ্যা প্রায় ৫৪-৫৭টি।

গঙ্গা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা- এই চারটি নদীই সবচেয়ে কৌশলগত ও বিতর্কিত।

১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হলেও তিস্তা চুক্তি আজও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আপত্তিতে আটকে আছে।

বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট- ন্যায্য পানির হিস্যা কোনো করুণা নয়, এটি দেশের জনগণের অধিকার।

ভবিষ্যৎ সঙ্কটের আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে বাঁধ নির্মাণ, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ হ্রাস এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও সঙ্কটময় করে তুলছে। পানি সঙ্কট শুধু কূটনৈতিক ইস্যু নয়- এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সাথেও সরাসরি যুক্ত।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ভাঙার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্তাপন

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক আইনে প্রাপ্য অভিন্ন নদীর পানির অংশ না পেলে আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন ছাড়া আর কোন পথ থাকছে না। এ কারণে ঢাকা ক্রমশ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সঙ্কটকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ফোরামে তুলে ধরার কৌশল বিবেচনা করছে। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, বিষয়টিকে বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন করা ছাড়া কৌশলগত চাপ তৈরির বিকল্প কমে আসছে। জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক পানি আইন ফোরাম, জলবায়ু সম্মেলন এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে বিষয়টি উপস্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ফোরামে ইস্যুটি তোলা হলে এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কাঠামো ভাঙবে না, বরং ন্যায্য পানিবণ্টনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক নীতি ও আইনের আলোকে চাপ তৈরি করবে। ১৯৯৭ সালের জাতিসঙ্ঘের ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটারকোর্স কনভেনশন, ন্যায্যতা ও ক্ষতিহীন ব্যবহারের নীতি- এসব মানদণ্ড বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক যুক্তিতে ব্যবহার করতে পারে।

তবে কূটনীতিকদের একাংশ সতর্ক করছেন, আন্তর্জাতিকীকরণে ভারত প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান নিতে পারে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে। ফলে বিষয়টি কতটা কৌশলগতভাবে তোলা হবে, কোন ফোরামে উপস্থাপন করা হবে এবং কী ভাষায় দাবি উপস্থাপন করা হবে- এই প্রশ্নগুলো এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীরভাবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি ছাড়া আন্তর্জাতিক ফোরামে ইস্যু তোলা উল্টো চাপও তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘ অচলাবস্থা ভাঙতে এটি একটি সম্ভাব্য লিভারেজ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।