আলকামা সিকদার মধুপুর (টাঙ্গাইল)
শাল-গজারি বনে ঘেরা টাঙ্গাইলের মধুপুর ‘আনারসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার লাল মাটি ও আবহাওয়া আনারস চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষ হয়ে আসছে। তবে চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে বাগানে একসাথে বিপুল পরিমাণ আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। বিপরীতে ক্রেতা না বাড়ায় গত বছরের তুলনায় দাম কম পাচ্ছেন কৃষকরা।
বছরের ১২ মাসের মধ্যে জুন, জুলাই ও আগস্ট- এই তিন মাস আনারসের ভরা মৌসুম। চলতি ভরা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে অনেক বাগানে একসাথে আনারস পেকে যাচ্ছে। ফলে বাজারে প্রচুর আনারস উঠছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ আনারসের সরবরাহে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ফলে বাজারে আনারসের দাম কমে গেছে। কৃষকরাও বাধ্য হচ্ছেন কম দামে আনারস বিক্রি করতে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মধুপুরে ছয় হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার (জায়ান্ট কিউ) চার হাজার ৩০৭ হেক্টর, জলডুগি দুই হাজার ৩১৮ হেক্টর এবং এমডি-২ জাতের আনারস ১০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এবার প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ উপজেলায় প্রায় ৯০০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকার আনারস বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে এ বছর। তবে সময়মতো আনারস বিক্রি করতে না পারলে কৃষকরা লোকসানে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মহিষমারা গ্রামের কৃষক ছানোয়ার হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার আনারসের চাষ বেশি হয়েছে। ভরা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে বাগানে একসাথে অনেক আনারস পেকে যাচ্ছে। এতে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতা বাড়েনি। ফলে দাম কমেছে। তিনি বলেন, রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে দাম কমে যাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। নিরাপদ আনারস উৎপাদনে কৃষকরা চেষ্টা করছেন।
শালিকা গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরু থেকেই বৃষ্টির কারণে বেশি আনারস পেকে গেছে। এ কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং গত বছরের তুলনায় দাম কিছুটা কম। তবে বর্তমানের প্রচলিত দামে এখনো লোকসান হচ্ছে না।
জলছত্র বাজারের আড়তদার মো: মনির হোসেন বলেন, এ বাজার থেকে সারা বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আনারস, কাঁঠাল, কলাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পাঠানো হয়। মৌসুমের শুরুতে আনারসের বাজার ভালো থাকলেও অতিবৃষ্টির কারণে এখন দাম কিছুটা কম। বাগানে একসাথে আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু পাইকারের সংখ্যা আগের মতোই, ফলে দাম বাড়ছে না।
তবে আনারস চাষে বিভিন্ন ধরনের গ্রোথ হরমোন ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। মহিষমারা গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ রহমান বলেন, আনারসের আকার বড় করতে কেউ কেউ প্যানোফিক্স, ক্রপকেয়ার ও বোরণজাতীয় এক ধরনের মেডিসিন ব্যবহার করেন। এই মেডিসিনের অতিরিক্ত ব্যবহার অপরিপক্ব গাছে ফল ধরানো ও দ্রুত পাকানোর ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানান। অর্থাৎ স্বাভাবিক ভাবে যেখানে ২৪ মাসে একটি গাছে ফল ধরে, সেখানে এই মেডিসিন ব্যবহার করে সেই গাছে ১৮ মাসেই ফল ধরানো সম্ভব। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের উপকরণ প্রয়োগকে চাষিরা ‘গর্ভবতী’ নামে অভিহিত করেন। মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্যের মতো আনারসের বাজারও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। গত বছরের তুলনায় এবার দাম কমার মূল কারণ অতিবৃষ্টিতে একসাথে বাগানভর্তি আনারস পেকে যাওয়া এবং সেই তুলনায় ক্রেতা না বাড়া। রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। তবে স্বাদের কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষকদের সুষম সার ও অনুমোদিত মাত্রায় উপকরণ ব্যবহারে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মধুপুরের আনারসের বাজার সম্প্রসারণে আধুনিক বিপণনব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।



