- বেসরকারি খাতে ঋণে ভাটা
- মুদ্রা সৃষ্টির সক্ষমতা কমে যাচ্ছে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক দিকে মুদ্রা সরবরাহ (এম-২), রিজার্ভ মানি এবং ব্যাংকিং খাতের আমানত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, অন্য দিকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির সর্বশেষ সূচক দিয়ে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত মে মাস শেষে মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। একই সময়ে রিজার্ভ মানি বেড়েছে ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ, কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চিত্র অর্থনীতিতে মুদ্রাসরবরাহ বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদন, শিল্প ও কর্মসংস্থানে পর্যাপ্তভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না। বরং সরকারের ঋণগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পদের উন্নতিই বর্তমানে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মে শেষে ব্রড মানির (এম-২) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ২১ লাখ ২৬ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ১২.৪৫ শতাংশ। জুলাই-মে সময়ে ব্রড মানি বেড়েছে দুই লাখ ১৬ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে বৃদ্ধি ছিল মাত্র ৯৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, জুন ২০২৬-এর জন্য ব্রড মানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০.৮০ শতাংশ। কিন্তু মে মাসেই প্রবৃদ্ধি সেই লক্ষ্যমাত্রাকে অতিক্রম করেছে।
এ দিকে আলোচ্য সময়ে বৈদেশিক সম্পদে বড় উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিট বৈদেশিক সম্পদের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। মে ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিট বৈদেশিক সম্পদ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৩ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল দুই লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। এক বছরে এর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩১.৯৭ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৩১ শতাংশ। জুলাই-মে সময়ে বৈদেশিক সম্পদ বেড়েছে ৪৭ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে বৈদেশিক সম্পদ কমেছিল ১৫ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা এই উন্নতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু বৈদেশিক সম্পদই বাড়েনি, দেশীয় সম্পদও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিট দেশীয় সম্পদ গত মে শেষে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ২৭ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯.৫৪ শতাংশ, যা আগের বছরের ৮.৩৮ শতাংশ থেকে বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির মাধ্যমে।
বেসরকারি খাতের ঋণের জোয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মে শেষে সরকারি খাতে মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ২৯ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এক বছর আগে ছিল পাঁচ লাখ ২১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ২০.৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ২৪.৬১ শতাংশ, যা পরিমাণে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ১২ কোটি টাকা। জুলাই-মে সময়ে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৯৭ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের তহবিল সরকারি খাতে চলে যাচ্ছে।
অন্য দিকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। মে শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এক বছর আগে ছিল ১৭ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৯৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ৭.১৭ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। জুলাই-মে সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৭৭ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০.২০ শতাংশ। অর্থাৎ বাস্তব প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণের চাপ, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই কমে গেছে। এ অবস্থায় শিল্পায়ন, নতুন কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়তে পারে।
এ দিকে দীর্ঘ সময় ভাটা থাকার পর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মে শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.৪১ শতাংশ। এর মধ্যে মেয়াদি আমানত বেড়েছে ১২.১৫ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। অন্য দিকে চলতি আমানত সামান্য কমে দুই লাখ ছয় হাজার ১৮ কোটি টাকা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, গ্রাহকরা তুলনামূলক বেশি সুদের আশায় দীর্ঘমেয়াদি আমানতের দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমানত বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থও বাড়ছে। ব্যাংকের বাইরে প্রচলিত নগদ অর্থ মে শেষে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে ছিল দুই লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮.৯২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, নগদ অর্থের এত দ্রুত বৃদ্ধি একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও অন্য দিকে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও নগদ লেনদেনের প্রবণতা বৃদ্ধিরও প্রতিফলন হতে পারে।
এ দিকে, রিজার্ভ মানিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছে আলোচ্য সময়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ মানি মে শেষে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। এক বছর আগে ছিল তিন লাখ ৯৮ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। এক বছরে বৃদ্ধি হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির হিসাবে ২১.৭৪ শতাংশ। এটি গত বছরের একই সময়ের ১০.৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দ্বিগুণেরও বেশি। অপর দিকে, মুদ্রা সৃষ্টির সক্ষমতা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত মে শেষে মানি মাল্টিপ্লায়ার দাঁড়িয়েছে ৪.৯২, যা এক বছর আগে ছিল ৫.৩৩। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য থাকলেও সেই অর্থ পুরোপুরি ঋণে রূপান্তরিত হচ্ছে না। ফলে মুদ্রা সৃষ্টির সক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে।
এমনি পরিস্থিতিতে, অর্থনীতিতে তারল্য বাড়ছে এবং মুদ্রা সরবরাহও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বৈদেশিক সম্পদ ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে। ব্যাংক আমানত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, যা আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বিপরীতে সরকারের ব্যাংকঋণ দ্রুত বাড়ছে, যা ‘ক্রাউডিং আউট’ ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে-অর্থাৎ সরকারি ঋণের চাপে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- এক দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, অন্য দিকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা। যদি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ৫ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থানে থাকে, তাহলে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্য দিকে বৈদেশিক সম্পদ, আমানত ও রিজার্ভ মানির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও সেই তারল্যকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



