পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি প্রশ্রয় দেয়া হবে না : অর্থমন্ত্রী

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বর্তমান সরকার পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিকে প্রশ্রয় দেবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতি অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। এতে অর্থনীতি রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পড়ে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতেই সরকার ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি’ বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে।

গতকাল শনিবার বিকেলে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সদস্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ইআরএফের পক্ষ আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সন্নিবেশ করার জন্য বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

টাকা ছাপিয়ে সরকারের ঋণ গ্রহণের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, টাকা ছাপিয়ে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, এই ধরনের নীতিতে এক দিকে সুদের হার বেড়ে যায়, অন্য দিকে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউড আউট’ হয়ে পড়ে, যা কোনোভাবেই টেকসই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়।

প্রসঙ্গত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত মার্চ মাসে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি নীতিগত অবস্থানে থাকতে চায়, যেখানে উচ্চমাত্রার মুদ্রা সরবরাহ (হাই পাওয়ার মানি) তৈরি করে মূল্যস্ফীতি বাড়ানো হবে না এবং বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে না। এটা আমাদের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান গাইডলাইন ও প্রিন্সিপাল।

মন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির সুফল যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের সরাসরি ক্ষমতায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিবারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নারীরাই সবচেয়ে দক্ষ, তাই তাদের হাতে অর্থ পৌঁছালে তা সাশ্রয় ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার বেশি হলে পরিবারের জীবনমান কমে যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষের আয় কার্যত বেড়ে যায়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাতকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় এমপ্লয়ার হচ্ছে এসএমই খাত। এ খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল শিল্পকে (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘আন্ডার পারফর্ম’ করছে।

ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘খুবই কঠিন কাজ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না হলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভোকেশনাল শিক্ষায় জোর দেয়া হচ্ছে, যাতে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পায়।

জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজারব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ দিয়ে বা টিসিবি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারকে ডিমান্ড ও সাপ্লাই অনুযায়ী চলতে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার খরচ কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।

এ দিকে অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাঠামোগত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক-বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।

গতকাল শনিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট দৌলত আকতার মালার নেতৃত্বে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

প্রস্তাবগুলো

জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা

ইআরএফ বলছে, আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা জরুরি, না হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

সংগঠনটির মতে, শুধু সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট ভাঙা, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপণ্যে ডিলার থেকে খুচরা পর্যায়ে মুনাফা নির্ধারণ করে তা কার্যকর করতে হবে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ওপেন মার্কেট সেলের মতো উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইআরএফ, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা পায়।

সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ

অভ্যন্তরীণ ঋণ নিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো বন্ধ করতে হবে এবং উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একই সাথে পুঁজিবাজারে নতুন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব

দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের মানের হাসপাতাল স্থাপনের পাশাপাশি ওষুধের দাম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি কেন হচ্ছে তা তদন্ত এবং আউট অব পকেট ব্যয় কমানোর চেষ্টা করতে হবে।

ঝুঁকিভাতা ও বৈষম্য

পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর জন্য বিদ্যমান ঝুঁকিভাতা আর্থিক বৈষম্য তৈরি করছে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহার করতে হবে।

বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান কমছে উল্লেখ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবন এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ করতে হবে।

জ্বালানি, সুশাসন ও আর্থিক খাত

জ্বালানি নিরাপত্তায় সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, ট্রান্সফার প্রাইসিং আইনের প্রয়োগ এবং ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ বন্ধ করতে হবে।

রাজস্ব কাঠামো সংস্কার

কর নেট সম্প্রসারণ, প্যাকেজ ভ্যাট পুনর্বহাল, কর ছাড়ের স্বচ্ছতা এবং এনবিআরের ডাটাবেজের সাথে ব্যাংক তথ্য সমন্বয় করা।

জনকল্যাণে স্বস্তির প্রস্তাব

নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার ০.৫ শতাংশে সীমিত রাখা, ছোট সঞ্চয়ে আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার, লভ্যাংশ কর কমানো এবং কর ফেরত সহজ করতে হবে।

ইআরএফ বলেছে, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি রোধে এনবিআরের ডাটাবেজ ব্যবহারের বিধান চালু করা গেলে তা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘গেম-চেঞ্জার’ হতে পারে।