অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও স্বাভাবিক হতে পারছে না দেশের অর্থনীতি। এক ধরনের গুমোট অবস্থার মধ্য দিয়ে পার করছে দেশের আর্থিক খাত। এ মুহূর্তে দেশে জ¦ালানি তেলের সঙ্কট এ গুমোট অবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী। পুরো সপ্তাহজুড়ে এরই প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ার পরও প্রত্যাশিত আচরণ ফিরে পাচ্ছে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও জ¦ালানি তেলের এ স্বল্পতার খুব দ্রুত কোনো সমাধানও দেখছেন না সাধারণ মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার এ ব্যাপারে আশ^স্ত করা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভোক্তারা পাচ্ছেন ভিন্ন বার্তা। ফলে এ গুমোট ভাব কাটছে না।
পয়লা বৈশাখের সরকারি ছুটির কারণে গত সপ্তাহে পুঁজিবাজার খোলা ছিল ৪ কর্মদিবস। এর মধ্যে তিন দিন সূচকের নামমাত্র উন্নতি ঘটলেও একদিন পতন ঘটে। প্রায় প্রতিদিনই সূচকের উন্নতি দিয়ে লেনদেন শুরু করলেও মাঝখানে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপের কারণে বাজারগুলো এ উন্নতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। আর এভাবেই গত সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি দশমিক ৮৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। রোববার ৫ হাজার ২৫৭ দশমিক ৭০ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে স্থির হয় ৫ হাজার ২৫৬ দশমিক ৮৪ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ সূচকটি ১১ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। তবে বিশেষায়িত অন্য সূচক ডিএসই শরিয়াহ ৩ দশমিক ২৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।
সূচকে মিশ্র আচরণ দেখা গেলেও গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটে। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলেই লেনদেনের এ উন্নতি। এ সময় ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৮১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ২২ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির গড় লেনদেন ছিল ৬৬৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। তবে সরকারি ছুটির কারণে লেনদেন একদিন বন্ধ থাকায় গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৭৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসে ছিল ৩ হাজার ৩৪৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
লেনদেনের উন্নতি ঘটলেও গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনের কিছুটা অবনতি ঘটে। প্রধান দুই সূচক ডিএসইএক্স ও ডিএসই-৩০ সূচকের অবনতির ফলেই বাজার মূলধনের এ অবনতি। গত সপ্তাহশেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৫ দশমিক ৬৩১ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে বাজারটির মূলধন কমেছে ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকা।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যেকোনো মুহূর্তেই পুঁজিবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে, এ ধারণা থেকেই সম্প্রতি বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। যেখানে আগে বাজারের লেনদেন ৫০০ কোটির আশপাশে ঘুরপাক খেত সেখানে যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও প্রায় প্রতিদিনই ৭০০ কোটির ঘরে লেনদেন নিষ্পত্তি করছে ঢাকা শেয়ার বাজার।
এ দিকে দেশের শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়ন ও চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। বৈঠকে কমিশনার মু. মোহসিন চৌধুরী, মো: আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো: সাইফুদ্দিনসহ বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালামের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভায় কমিশনের ভূমিকা, কার্যক্রম, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সক্ষমতা, বাজারের ইকোসিস্টেম ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা করা হয়। পাশাপাশি শেয়ারবাজার উন্নয়নে বাস্তবায়িত বিভিন্ন উদ্যোগ, অর্জন ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজার সংস্কার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিএসইসির নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে তানভীর গনিকে অবহিত করা হয়। তিনি এ সময় বাজারের সামগ্রিক অবস্থা, চলমান কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ইস্যু সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় মতামত প্রদান করেন।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১২ এপ্রিল বিএসইসি পরিদর্শন করেন তানভীর গনি। সে সময় দীর্ঘ আলোচনায় শেয়ারবাজার উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রীর পুঁজিবাজার বিষয়ক এই বিশেষ সহকারী।
গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ। প্রতিদিন গড়ে ৩৬ কেটি ২৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির, যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে ২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে সিটি ব্যাংক ছিল লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ দখলে রাখে ব্যাংকটি। ডিএসইর সপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে একমি পেস্টিসাইডস, লাভেলো আইসক্রিম, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, কেডিএস এক্সেসরিস, গোল্ডেন সন, মীর আখতার হোসাইন ও পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল পিএফআই ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। সপ্তাজুড়ে ফান্ডটির মূল্য ৩০ দশমিক ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ৩০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় ছিল মীর আখতার হোসাইন। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে পিপলস লিজিং, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, ডেল্টা স্পিনার্স, এফএএস ফিন্যান্স, গোল্ডেন সন ও হামিদ ফেব্রিক্স লিমিটেড।



