মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের শোয়ে (ঝযবি) গ্যাস প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পুরনো প্রস্তাবটি নতুন করে আলোচনায় আসায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঘিরে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে, সম্ভাব্য পাইপলাইনের ভৌগোলিক রুটের একটি বড় অংশ যদি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তবে প্রকল্পটির আর্থিক দিক ছাড়াও সার্বভৌম নিরাপত্তা, কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও কূটনৈতিক জটিলতা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি মাসের শুরুতে ঢাকায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সাথে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মোয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পর শোয়ে গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনে বাংলাদেশে গ্যাস আনার বিষয়টি পুনরুজ্জীবিত হয়। তবে এর কয়েক দিন পরই বার্মা নিউজ ইন্টারন্যাশনালে (ইঁৎসধ ঘবংি ওহঃবৎহধঃরড়হধষ) প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আরাকান আর্মির (এএ) সরাসরি সম্মতি ও সহযোগিতা ছাড়া এই প্রকল্পটি মাঠে বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
প্রতিবেদনটিতে উদ্ধৃত রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আরাকান আর্মি বর্তমানে রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের সংলগ্ন পুরো অঞ্চলের ওপর শক্তিশালী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের (নেইপিডো) সাথে কোনো চুক্তিতে উপনীত হলেও, প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ পরিচালনায় অরাষ্ট্রীয় এই সশস্ত্রগোষ্ঠীর ভূমিকা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
দেশের গ্যাসের বিপুল চাহিদা বনাম সীমিত সরবরাহ
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে নতুন গ্যাসের টেকসই উৎস উদ্ভাবন এখন এক জরুরি অগ্রাধিকার। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহচাহিদা অপেক্ষা বহুলাংশে কম, যা শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ খাত, সার কারখানা ও অভ্যন্তরীণ বাসাবাড়িতে তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি করছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই অসামঞ্জস্য দূর করতে বাংলাদেশকে একই সাথে আমদানিনির্ভরতা এবং দেশীয় ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান-এই দুই পথেই এগোতে হচ্ছে।
বলা হচ্ছে- এই কঠিন বাস্তবতায় মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে পাইপলাইনে গ্যাস নিয়ে আসতে পারলে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর অত্যধিক চাপ কিছুটা হলেও প্রশমিত হতে পারে। এতে সরবরাহের উৎসে এক ধরনের আঞ্চলিক বৈচিত্র্যও তৈরি হবে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসের এই বৈচিত্র্য তখনই প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, যখন নতুন উৎসটি রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তার দিক থেকে সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত হয়। মূল ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্থিতিশীল কোনো একটি উৎসের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে অপর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অরাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা করিডোরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে, তাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা’ বলা চলে না।
প্রকল্পের মূল কৌশলগত ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণের সমীকরণ
শোয়ে গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে এর ভৌগোলিক রুট এবং অঞ্চলের প্রকৃত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্রীয় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, যে ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কার্যকর প্রশাসনিক বা সামরিক নিয়ন্ত্রণ নেই।
যদি পাইপলাইন সচল রাখতে বাংলাদেশকে আরাকান আর্মির সাথে কোনো অপ্রকাশ্য বা প্রত্যক্ষ সমঝোতায় যেতে হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চরম কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে একটি সুনির্দিষ্ট অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র মানবতাবিরোধী গোষ্ঠীকে কার্যত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার শামিল হবে। অন্য দিকে, তাদের সাথে কোনো রকম আলোচনা বা সমঝোতা ছাড়া এই প্রকল্প জোরপূর্বক বাস্তবায়ন করতে গেলে অবকাঠামোটির ওপর নিয়মিত হামলা ও অচলাবস্থার চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে যাবে।
বিশ্লেষকদের প্রবল আশঙ্কা, ভবিষ্যতে পাইপলাইনটি চালু হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যাসপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক দরকষাকষিকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি সৃষ্টি হবে। ফলে সস্তা জ্বালানি পাওয়ার সুবিধার চেয়ে কৌশলগত জিম্মিদশার নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাই এখানে প্রকট।
মানবাধিকার, মাদক ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন
প্রকল্পটির কাঠামোগত সুরক্ষার সাথে বাংলাদেশের কৌশলগত রোহিঙ্গা নীতি এবং জাতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা গভীরভাবে জড়িত। রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মির কর্তৃত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে সেখানকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র আন্তর্জাতিক নথিপত্রে উঠে এসেছে।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ২০২৪ সালে বুথিডাং শহর দখলের পর রোহিঙ্গাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচার সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করে। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৬ সালের মে মাসের প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালের ২ মে বুথিডাংয়ের হোইয়ার সিরিগ্রামে আরাকান আর্মি কর্তৃক অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশু চরম নৃশংসতার শিকার বা নিখোঁজ হয়, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশিই ছিল শিশু।
জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য মতে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারের ওই অঞ্চলে নতুন করে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে আশ্রয় নিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত অপরাজনীতি ও মাদক চোরাচালানের জটিল হিসাব। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চার কোটি ৩৫ লাখেরও বেশি অ্যাম্পেটামিন জাতীয় ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ ট্যাবলেট জব্দ করা হয়, যার অবৈধ অর্থনৈতিক লাভ মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র কেনার প্রধান উৎস বা ‘নার্কো-কারেন্সি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তা ছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসের ব্যবধানে আরাকান আর্মি কর্তৃক ৩২৮ জন বাংলাদেশী জেলে অপহৃত বা আটক হয়েছেন। ফলে যে সীমান্ত অঞ্চলে অনবরত সহিংসতা, অপহরণ ও অস্ত্র-মাদকের কারবার চলছে, সেখানে কোটি কোটি ডলারের কৌশলগত অবকাঠামো স্থাপন করা জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে কতটুকু সমীচীন তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাখাইনে চীনের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণীয় দিক
রাখাইন রাজ্যে কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতাকে একটি আদর্শ কেস-স্টাডি হিসেবে দেখা যেতে পারে। মিয়ানমারবিষয়ক গবেষণা সংস্থা আইএসপি-মিয়ানমার-এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালের শেষভাগেই রাখাইনে চীনের চলমান ১১টি বৃহৎ প্রকল্পের মধ্যে দু’টি পুরোপুরি এবং আটটি আংশিকভাবে আরাকান আর্মির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে রাখাইনের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিজেদের মেগা-প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখতে চীনকে বিদেশী ‘প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসেস’-এর ওপর নির্ভর করতে হয়। চীন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং মিয়ানমারের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অপরিসীম। এত বিপুল অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বেইজিংকে যেখানে নিজেদের বিনিয়োগ বাঁচাতে অতিরিক্ত বেসরকারি সশস্ত্র নিরাপত্তার সাহায্য নিতে হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো সীমিত আন্তর্জাতিক লিভারেজ থাকা দেশের পক্ষে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে কয়েক শ’ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা সহজেই অনুমেয়।
কেবলমাত্র মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সামরিক সরকারের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করলেই যে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রাষ্ট্রীয় আইনি বৈধতা আর ভূখণ্ডের বাস্তব রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’টি বিষয়। পাইপলাইন নির্মাণ, ভূমি জরিপ, প্রতিনিয়ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কারিগরি মেরামতের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা আবশ্যক। অস্থিতিশীল যুদ্ধক্ষেত্রে এই সহযোগিতা না পাওয়া গেলে নির্মাণব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে; একই সাথে বীমা প্রিমিয়াম, অর্থায়নের সুদ এবং নিরাপত্তাব্যয় বেড়ে গিয়ে এটি একটি অর্থনৈতিক বোঝার জন্ম দেবে।
বিনিয়োগের ফাঁদ ও ‘অসম দরকষাকষি’
স্থলপথে পাইপলাইন নির্মাণের জন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পর তা যেভাবেই হোক সচল রাখতে বাংলাদেশের ওপর এক ধরনের কাঠামোগত মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হবে। তখন পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া বা গ্যাসপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা ঢাকার নীতিনির্ধারকদের যেকোনো সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করবে।
বিবেচ্য বিষয় স্বাভাবিক চুক্তি পাইপলাইন নির্ভরতার ঝুঁকি
দরকষাকষির শক্তি ক্রেতা ও বিক্রেতার সমতা অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হাতে কৌশলগত জিম্মিদশা কূটনৈতিক নমনীয়তা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি জ্বালানি সচল রাখতে নীতিগত আপস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চুক্তিভিত্তিক সমাধান সশস্ত্র হামলা ও ব্ল্যাকমেইলের আশঙ্কা।
এটি একটি সুস্পষ্ট অসম দরকষাকষির পরিস্থিতি তৈরি করবে- যেখানে বাংলাদেশ গ্যাসের প্রয়োজনে অবকাঠামোটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, আর ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী বিদ্রোহী গোষ্ঠী সেই সুযোগকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সীমান্ত সুরক্ষা কিংবা রাখাইনে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোচ্চার হতে গেলে, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার পরোক্ষ হুমকি ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিকে নমনীয় করতে বাধ্য করতে পারে।
শোয়ে গ্যাসের দিকে ঢাকা, নাকি নিজের সমুদ্রের দিকে
এ দিকে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রক্রিয়ার অন্তরালে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। বিদেশী সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকার দিকে না তাকিয়ে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নিজস্ব সামুদ্রিক সীমানায় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি আনা কি অধিক যুক্তিযুক্ত নয়?
শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের তীব্র অভাব, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত প্রাথমিক জ্বালানির অনিশ্চয়তা এবং এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার খরচের কারণে বাংলাদেশকে নতুন উৎস খুঁজতেই হবে। কিন্তু আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার রূপরেখা আঁকতে গিয়ে সাময়িক সঙ্কট সমাধানের ভুল পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদি জিম্মিদশা ডেকে আনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
শোয়ে গ্যাসকে বাংলাদেশের জন্য নতুন আমদানির উৎস ভাবার আগে এর বিদ্যমান সরবরাহ চুক্তি খতিয়ে দেখা দরকার। পোসকোর তথ্যানুযায়ী, মিয়ানমারের অফশোর এ-১ ও এ-৩- ব্লকের শোয়ে, শোয়ে পিউ এবং মিয়া ক্ষেত্র থেকে উত্তোলন করা গ্যাস মিয়ানমার-চীন সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৭৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলপাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, যার বেশির ভাগই যায় চীনে।
চীন ইতোমধ্যেই এই ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস ক্রয়ের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে রেখেছে। সুতরাং, বাংলাদেশকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে হলে হয় নতুন কূপ থেকে উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে, নতুবা চীনকে দেয়ার কথা থাকা বিদ্যমান প্রবাহ থেকে অংশ কেটে বাংলাদেশকে দিতে হবে। দ্বিতীয় বিকল্পটি গ্রহণ করলে তা বাণিজ্য ছাড়িয়ে বেইজিং ও নেইপিডোর সাথে ত্রিপক্ষীয় আইনি জটিলতায় রূপ নেবে।
তাই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রিজার্ভ অডিট, উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই এবং আইনি চুক্তি পর্যালোচনা করা।
স্থলপথের ‘সস্তা’ বনাম সমুদ্রপথের ‘নিরাপত্তা’
রাখাইন হয়ে স্থলপথে পাইপলাইন টানার প্রধান আকর্ষণ হলো কম দূরত্ব ও প্রাথমিক নির্মাণব্যয় কম হওয়া। কিন্তু ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ‘সস্তা’ পথই সবচেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। প্রকল্পের আসল খরচ বের করতে হলে কেবল নির্মাণ ব্যয় হিসাব করলেই চলবে না; এর সাথে রক্ষণাবেক্ষণ, অতিরিক্ত বীমা মাশুল, সামরিক নিরাপত্তা ও সরবরাহ বিঘœ ঘটলে যে ক্ষতি হবে সব মিলিয়ে মোট লাইফ সাইকেল কস্ট হিসাব করতে হবে।
এর বিকল্প হিসেবে উঠে আসে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম পর্যন্ত গভীর সমুদ্র পাইপলাইন নির্মাণ করা। যদিও মিয়ানমারের অস্থিতিশীল স্থলভাগ এড়িয়ে যাওয়ার এটি একটি চমৎকার উপায়, তবে এতে প্রারম্ভিক মূলধন ব্যয় প্রায় ২.৫ থেকে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। সমুদ্রতলের গভীরতা, তলদেশের ভূপ্রকৃতি এবং ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এই বিপুল খরচ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, ব্যাংকযোগ্য তা অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
এতে মূল প্রশ্নটি হবে : ২০ বছর মেয়াদে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে গ্যাস নিয়ে এলে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের চূড়ান্ত সরবরাহ খরচ কত পড়বে? কেননা সমুদ্রপথে আনা গ্যাসের দাম যদি আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি প্রক্রিয়াকরণ করে দেশে আনার খরচের প্রায় সমান হয়, তবে এত জটিল আন্তর্জাতিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করার যৌক্তিকতা কমে যায়।
আসল কৌশলগত পথ : শোয়ে গ্যাস নাকি বঙ্গোপসাগর অনুসন্ধান
আমদানিকৃত শোয়ে গ্যাস এবং দেশের নিজস্ব সামুদ্রিক ব্লকে অনুসন্ধানকে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী বিষয় হিসেবে দেখা ভুল হবে। শোয়ে গ্যাস যদি ঝুঁকিমুক্তভাবে এবং সুলভমূল্যে পাওয়া যায়, তবে তা কেবল সাময়িক বা সম্পূরক সরবরাহ হতে পারে। কিন্তু জাতীয় সার্বভৌমত্বের টেকসই ভিত্তি হতে হবে বঙ্গোপসাগরে নিজস্ব সম্পদ অনুসন্ধান।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ড বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তার নিজস্ব সামুদ্রিক সীমানায় ২৬টি অফশোর ব্লক (১১টি অগভীর এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের) আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির (আইওসি) জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। নতুন প্রণীত নতুন প্রণীত মডেল উৎপাদন শেয়ারিং চুক্তি (এমপিএসসি-২০২৬)-এ বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ কিছু আকর্ষণীয় শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে সমুদ্রসীমায় আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও সম্পদের কতটুকু অংশ শেয়ার করছে তাও খতিয়ে দেখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে নি¤œলিখিত সাতটি সূচকে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি: প্রথমত, গ্যাসের দাম : আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ; দ্বিতীয়ত, খরচ উদ্ধার : বিনিয়োগকারী কোম্পানি কত দ্রুত তাদের প্রাথমিক খরচ তুলে নিতে পারবে; তৃতীয়ত, মুনাফা ভাগাভাগি: বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস আবিষ্কৃত হলে রাষ্ট্রের ন্যায্য অংশ সুনিশ্চিত করা। চতুর্র্থত, দেশীয় বাজারের অধিকার : উত্তোলিত গ্যাস আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা। পঞ্চমত, রফতানি অধিকার : উদ্বৃত্ত গ্যাস রফতানির সুযোগ দেয়া হবে কি না। ষষ্ঠত, চুক্তির মেয়াদ : অনুসন্ধান ও উৎপাদনের যৌক্তিক সময়সীমা। সপ্তমত, ডিপরিচালনা দায়বদ্ধতা : মেয়াদ শেষে সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব গ্রহণ।
সম্প্রতি ব্রিটিশ বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বিপি (ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম) পেট্রোবাংলার বিড ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে যোগাযোগ করেছে- যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক ব্লকের ভূরাজনৈতিক মূল্যায়নে ইতিবাচক সঙ্কেত দেয়। তবে নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, ডকুমেন্ট কেনা আর বাণিজ্যিক আবিষ্কার এক বিষয় নয়। দেশের অফশোর কৌশলকে অতি-আশাবাদের ওপর না ভাসিয়ে ভৌগোলিক তথ্য ও শক্তিশালী আইনি চুক্তির ওপর শক্তভাবে দাঁড় করাতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য ৩ স্তরের সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি কৌশল
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি তিন স্তরবিশিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন:
স্বল্পমেয়াদি স্তর- সরবরাহ নিরাপত্তার শক্তিশালীকরণ : কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একটি দেশের টার্মিনাল বা স্পট মার্কেটের সাময়িক অস্থিরতা যেন পুরো বিদ্যুৎ খাতকে অচল করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নিজস্ব রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মধ্যমেয়াদি স্তর- শোয়ে গ্যাসের বাস্তবমুখী ও কঠোর মূল্যায়ন : মিয়ানমারের সাথে শোয়ে গ্যাস আলোচনার পথ একেবারে রুদ্ধ করার দরকার নেই। তবে রাজনৈতিক আবেগে না ভেসে একটি নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক, আইনি এবং ভূরাজনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। চুক্তির প্রাথমিক শর্তেই থাকতে হবে সরবরাহ ব্যাহত হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং বিকল্প উৎস স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করার আন্তর্জাতিক আইনি অধিকার।
দীর্ঘমেয়াদি স্তর- বঙ্গোপসাগরের স্বাবলম্বিতা: এটিই হবে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। নিজের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস আবিষ্কার আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান ও রাজনৈতিক দরকষাকষির সামর্থ্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। অন্য একটি দেশের গ্যাস ক্ষেত্র সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্য আবিষ্কার জাতীয় সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে।
সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত সময় : চাবি থাকতে হবে বাংলাদেশের হাতে
মিয়ানমারের শোয়ে গ্যাস ক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনার প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক বা অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী মনে হলেও, সার্বিক ঝুঁকির বিচারে এটি অত্যন্ত সতর্কতার দাবি রাখে। দেশের নীতিনির্ধারকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধান পাঁচটি প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পেতে হবে: পাইপলাইনের সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ রুট কী হবে? সেই রুটের প্রতিটি কিলোমিটারের প্রত্যক্ষ সামরিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। গৃহযুদ্ধ বা সহিংসতা শুরু হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসপ্রবাহ নিশ্চিত করার আইনি ব্যবস্থা কী? আরাকান আর্মির মতো অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক রূপরেখা কী হবে? আকস্মিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডের বিকল্প ব্যাকআপ ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?
জ্বালানি নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কোনো একক উৎস বা ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক করিডোরের ওপর জিম্মি না হওয়া। শোয়ে গ্যাস প্রকল্প যদি নিতান্তই গ্রহণ করতে হয়, তবে কূটনৈতিক আলোচনার সব চাবিকাঠি বাংলাদেশের হাতে রাখতে হবে- যাতে কোনো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের শিল্প খাত ও বিদ্যুৎব্যবস্থাকে পঙ্গু করতে না পারে।
শোয়ে গ্যাস ক্ষেত্র হয়তো আজকের প্রয়োজনের একটি সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু স্বাধীন ও সমৃদ্ধ বঙ্গোপসাগরই হতে হবে বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার চূড়ান্ত গন্তব্য।



