কানাডায় তীব্র হচ্ছে অভিবাসী-বিরোধী হাওয়া, চরম ঝুঁকিতে মুসলিমরা

আলজাজিরা অনুসন্ধান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

কানাডায় সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসী-বিরোধী বক্তব্য ও মনোভাব তীব্রতর হওয়ায় দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় এক চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অধিকারকর্মীদের মতে, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষোভ থেকে তৈরি হওয়া এই অভিবাসী-বিরোধী মনোভাব এখন সরাসরি ‘মুসলিম-বিরোধী বর্ণবাদে’ রূপ নিচ্ছে। ফলে সাধারণ মুসলিমদের অরক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি তাদের ওপর সহিংসতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদে যেতে বাধা দেয়া বা প্রকাশ্য রাস্তায় হেনস্তার মতো ঘটনা এখন দেশটিতে নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কানাডার ইসলামোফোবিয়া মোকাবেলাবিষয়ক সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি আমিরা এলঘাওয়াবি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘এক চরম সঙ্কটময় মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত এক দশকে কানাডায় বেশ কয়েকটি মারাত্মক মুসলিম-বিরোধী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ফলে গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭) দেশগুলোর মধ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের দেশ এখন কানাডা। ২০১৭ সালে কুইবেক সিটির একটি মসজিদে বন্দুক হামলায় ছয়জন মুসল্লি নিহত হন, যা দেশটির ইতিহাসে উপাসনালয়ের ওপর সবচেয়ে বড় হামলা। এর চার বছর পর, ২০২১ সালে অন্টারিওর লন্ডনে হাঁটার সময় একটি মুসলিম পরিবারের চার সদস্যকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

দেশটিতে সাশ্রয়ী আবাসন সঙ্কট এবং আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির কারণে দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো অধিকাংশ কানাডিয়ান মনে করছেন যে দেশে অভিবাসনের হার অনেক বেশি। এই ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের ছড়ানো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমান সরকারগুলো শ্বেতাঙ্গদের হটিয়ে অশ্বেতাঙ্গদের জায়গা করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি টরন্টো ইসলামিক সেন্টারের বাইরে এক মুসলিম পরিবারের ওপর হামলার সময় হামলাকারী চিৎকার করে বলে, ‘লিবারেলরাই কি তোমাদের এখানে এনেছে’? এই মন্তব্যটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে আমিরা এলঘাওয়াবি বলেন, ‘এগুলো সবই বিপজ্জনক ও মিথ্যা বয়ান। শুধু বৈচিত্র্যের সংস্পর্শে এলেই যে মানুষের মন মানসিকতা বদলায় না, টরন্টোর ঘটনাই তার প্রমাণ।’

টরন্টো ইসলামিক সেন্টারের জেনারেল ম্যানেজার শাফনি নালির বলেন, এ ধরনের হামলার মূল বার্তাই হলো- ‘আপনারা এখানকার নন, আপনারা শুধু সাহায্য নিতে এসেছেন, সমাজে আপনাদের কোনো অবদান নেই।’

টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অপরাধবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ফাহাদ আহমেদ ব্যাখ্যা করেন, পশ্চিমা সমাজব্যবস্থায় মুসলিমদের প্রায়ই ‘বর্বর ও বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে তাদের ওপর হওয়া সহিংসতা অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে কানাডিয়ান গণমাধ্যমগুলোর সংবাদ পর্যালোচনা করে তিনি দেখান যে, গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর গণমাধ্যমগুলো মুসলিমবিরোধী হুমকির তুলনায় ইহুদি-বিরোধী হুমকিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে। ফলে ইসলামোফোবিয়াকে একটি নিম্নস্তরের সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এর প্রতিকারে রাষ্ট্রীয় সম্পদও কম বরাদ্দ করা হচ্ছে।

কানাডা সরকার অবশ্য দাবি করেছে যে তারা সব ধরনের ঘৃণাজনিত অপরাধ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে। ২০২৪ সালে অটোয়া ‘ঘৃণা মোকাবেলার কর্মপরিকল্পনা’ চালু করে ছয় বছরের জন্য ২৭০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বরাদ্দ করে। কিন্তু সম্প্রতি জাস্টিন ট্রুডোর সরকার অধিকার, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে একটি নতুন ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দিয়ে ইসলামোফোবিয়া এবং ইহুদি-বিদ্বেষ মোকাবেলার জন্য নিয়োজিত বিশেষ দূতদের কার্যালয় দু’টি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সরকারের এই পদক্ষেপে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে দেশটির অন্যতম শীর্ষ অধিকার সংগঠন ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস’। তারা জানায়, কানাডায় ইসলামোফোবিয়া যখন ক্রমাগত বাড়ছে, তখন এমন নিবেদিত ও টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব বন্ধ করে দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে সরকারের বর্ণবাদবিরোধী কৌশলের তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা ‘ডিপার্টমেন্ট অব কানাডিয়ান হেরিটেজ’ জানিয়েছে, নতুন এই উপদেষ্টা পরিষদটি পূর্বের দূতদের কাজের ওপর ভিত্তি করেই সামাজিক সংহতি ও সব ধরনের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

এ দিকে গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণার জবাবে ১৪ বছর বয়সী এক কানাডিয়ান মুসলিম কিশোর আহমেদ সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলে, ‘গণমাধ্যমে আপনারা মুসলিমদের সম্পর্কে যা শোনেন, প্রকৃত মুসলিমরা মোটেও তেমন নয়।’