বিশেষ সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের মোট সাধারণ পণ্য আমদানি-রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারবাহী পণ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপ (চবক) সব প্রধান সূচকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছে, যা দেশের লজিস্টিকস সমতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড : চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৫ সালে মোট ৩৪,০৯,০৬৯ টিইইউএস কনটেইনার, ১৩,৮১,৫১,৮১২ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪,২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.০৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১.৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ১,৩৩,৪৪২ টিইইউএস কনটেইনার, ১,৪১,৬৮,৭৯৮ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪০৬টি জাহাজ বেশি হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়েছে। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩৪ লাখ টিইইউএস অতিক্রম করেছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অপারেশনাল সমতা : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপরে তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কাস্টমসের কলম বিরতি, বিভিন্ন ধর্মঘট ও দেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিসহ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বন্দরটি তার অপারেশনাল দতা ধরে রেখেছে। বিশেষ করে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৩.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন বন্দরের সমতার শক্তিশালী প্রতিফলন।
ড্রাইডক টার্মিনালেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি : চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিএল) পরিচালিত কনটেইনার টার্মিনালগুলোতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৬,৯৮,৬৬৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.১৯ শতাংশ বেশি। শুধু অক্টোবর মাসেই সর্বোচ্চ ২০.১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে আধুনিক কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংযোজন, ইয়ার্ড ক্যাপাসিটি সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রম।
ওয়েটিং টাইম ও টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমে যুগান্তকারী উন্নতি : ২০২৫ সালে জাহাজের ওয়েটিং টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসে ৯ দিন, অক্টোবর ১৮ দিন, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ২৬ দিন করে ওয়েটিং টাইম শূন্য ছিল। জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে গড় জাহাজ টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ছিল ২.৫৩ দিন এবং কনটেইনার ডুয়েল টাইম ৯.৪৪ দিন।
এর ফলে আমদানি-রফতানিকারকরা দ্রুত পণ্য খালাস ও রফতানি করতে পারছেন, যা লিড টাইম হ্রাস, ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমা, এবং বিজিএমইএসহ রফতানি খাতে গতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ট্যারিফ হালনাগাদ ও রাজস্ব সাফল্য : চার দশক ধরে অপরিবর্তিত থাকা ১৯৮৬ সালের ট্যারিফ হালনাগাদ করে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা ও স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত নতুন ট্যারিফ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ এবং ১৪ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৫,৪৬০.১৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.৫৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩,১৪২.৬৮ কোটি টাকা। সরকারকে সরাসরি প্রদান করা হয়েছে ১,৮০৪.৪৭ কোটি টাকা, যা চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তর : চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বমানের বন্দরে রূপান্তরের ল্েয চালু হয়েছে অনলাইন ই-গেট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও কালেকশন ব্যবস্থা। এর ফলে সময়, অর্থ সাশ্রয়, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও যানজট হ্রাস পেয়েছে। শুধু ২৩ ডিসেম্বর একদিনেই সর্বোচ্চ ৬,৭৬১টি গেট পাস ইস্যু হয়।
নিরাপত্তা, সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : ইউএস কোস্টগার্ড আইপিএস পরিদর্শনে জিরো অবজারভেশন অর্জন বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি ইয়ার্ড সম্প্রসারণ, নতুন ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, কর্ণফুলী ড্রেজিং, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে-টার্মিনাল এবং লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালসহ একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
বিশেষ করে বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের প্রথম ‘গ্রিন পোর্ট’ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন : ২০২৫ সালে ১৭৫টি নতুন নিয়োগ ও ১,০৭২ জনের পদোন্নতি চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কর্মীদের আবাসন, পার্ক, শিাপ্রতিষ্ঠান লিজসহ নানা সামাজিক উদ্যোগ বন্দরের মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনাকে তুলে ধরে।
২০২৫ সাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপরে জন্য শুধু প্রবৃদ্ধির নয়, বরং রূপান্তরের বছর। প্রতিকূলতার মধ্যেও দ ব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর প্রমাণ করেছে- এটি শুধু একটি বন্দর নয়, বরং বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। ভবিষ্যতে একটি টেকসই, উদ্ভাবননির্ভর ও বিশ্বমানের বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে- এটাই এখন সময়ের দাবি।



