রাজশাহী ব্যুরো
নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সরকারের দুই মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে। এক দিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম বলেছেন, “হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন।” অন্য দিকে ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, “রাজশাহীর প্রতিষ্ঠান রাজশাহীতেই থাকবে।”
দুই মন্ত্রীর এমন বিপরীতমুখী অবস্থান নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমায় রাখেনি বরং এটি এখন উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
দৃঢ় অবস্থান ভূমিমন্ত্রীর : বুধবার সকালে রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নেসকো ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু।
তিনি বলেন, “রাজশাহীর প্রতিষ্ঠান রাজশাহীতেই থাকবে। কোন কন্ট্রাক্টর কোথায় কী বলল, তাতে কিছু যায় আসে না। নেসকো কেন, রাজশাহীর কোনো প্রতিষ্ঠান কোথাও যাবে না।” তিনি আরো বলেন, “এখানে কিছু লোক আছে, যারা ফ্যাসিস্টদের দালাল, তারা বিষয়টি নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে পারে। কিন্তু নো, দিস ইজ রাজশাহী। রাজশাহী হবে ফার্স্ট। আমার কাছে মন্ত্রিত্ব, এমপি বা মেয়রের পদ বড় নয়। এই মাটিতেই আমার জন্ম, এই মাটিতেই আমার মৃত্যু হবে। আল্লাহ আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছেন। কোন কন্ট্রাক্টর কোথায় কী বলল, তাতে কিছু আসে যায় না।”
ভূমিমন্ত্রীর এই বক্তব্য নেসকো ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন রাজশাহীবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে শুরু নতুন বিতর্ক : নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়ার সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর।
এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “রাজশাহীর মানুষ সারাদিন চিৎকার করে। অথচ পঞ্চগড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিদ্যুৎ সার্ভিস। আপনাদের এত ব্যথা লাগে কেন? ব্যথা লাগাবেন না ভাই। হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন।” একই বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, “যতই সমালোচনা করেন, পার্লামেন্টে বলেন বা বাইরে বলেন, আমিসহ বগুড়ার সাতজন এমপি বগুড়ার উন্নয়নের ব্যাপারে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নই।”
প্রতিমন্ত্রীর এসব মন্তব্য রাজশাহীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী মহলে প্রশ্ন ওঠে, উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় অন্য জেলায় সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কী?
পুরনো বিতর্কে নতুন উত্তাপ : নেসকোর প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র হিসেবে রাজশাহী থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে সরকার পরিবর্তনের পর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা নতুন করে সামনে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়ে নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন। যদিও এ বিষয়ে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
কেন উদ্বিগ্ন রাজশাহীবাসী : রাজশাহীবাসীর উদ্বেগের পেছনে রয়েছে অতীতের একাধিক অভিজ্ঞতা। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতর ও প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ অন্যত্র স্থানান্তর বা পুনর্বিন্যাসের কারণে রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব ক্রমেই কমছে। এর আগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় বগুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিভাগে একটি করে এ ধরনের কার্যালয় থাকলেও রাজশাহী বিভাগের ক্ষেত্রে কার্যত দু’টি কার্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, এটি রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ।
এমন বাস্তবতায় নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সম্ভাবনা রাজশাহীবাসীর উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের দাবি, উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র হিসেবে নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকা উচিত। অন্যথায় এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্থানান্তর হবে না বরং রাজশাহীর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন নজর সরকারের সিদ্ধান্তে : নেসকো ইস্যুতে সরকারের দুই মন্ত্রীর ভিন্নমুখী বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এক দিকে বগুড়ার পক্ষে প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্য অবস্থান, অন্য দিকে রাজশাহীর স্বার্থ রক্ষায় ভূমিমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, দুই জেলার মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় নেসকোর প্রধান কার্যালয় কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজশাহীবাসী। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ঠিকানা কোথায় হবে।



