বাংলাদেশে বন্ধ্যত্বের শিকার দম্পতিদের মধ্যে মানসিক চাপ নারীর বেশি, সেই তুলনায় পুরুষের কম। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় নারী ও পুরুষের মানসিক ও শারীরিক সঙ্কটের সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু স্পর্শকাতর চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও বারডেম এই দুই বিশেষায়িত হাসপাতালে ৬৫৮ জন বন্ধ্যত্বজনিত রোগীর (৩২০ জন পুরুষ ও ৩৩৮ জন নারী) ওপর পরিচালিত ক্রস-সেকশনাল জরিপে (একটি নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের রোগ, আচরণ, মতামত বা সামাজিক অবস্থার বর্তমান চিত্র তুলে ধরে। এখানে সময়ের সাথে পরিবর্তন দেখা হয় না) দেখা গেছে, বন্ধ্যত্বের কারণে নারীরা তীব্র মানসিক ট্রমা বা মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যান। অন্য দিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের বেশি প্রভাব পড়ছে পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ্যত্বের শিকার নারীদের মধ্যে হতাশা বা ডিপ্রেশনের হার ৬৭.২ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩১.৯ শতাংশ। নারীদের উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি (৭৫.১ শতাংশ কিন্তু পুরুষের ৩২.৮ শতাংশ) এবং মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের হারও (নারী ৬৯.২ শতাংশ বনাম পুরুষ ৩৭.৮ শতাংশ) পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পরিসংখ্যানগতভাবে এই ব্যবধান অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, নারীদের এই তীব্র মানসিক কষ্টের প্রধান কারণ বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটি এমন যে নারীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং বারবার ব্যর্থতার দীর্ঘ পথ নারীদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা পুরোপুরি ভেঙে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে গিয়ে নারীরা আরো বেশি ভেঙে পড়ছেন।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে পুরুষদের ক্ষেত্রে। বন্ধ্যত্বের শিকার পুরুষদের ৩৭.৫ শতাংশ কোনো না কোনো যৌন জটিলতায় (যেমন : ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা প্রাক-উত্তেজনা পতন) ভুগছেন। এই অবস্থাটা নারীদের (১৩.৯ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরুষদের এই যৌন কর্মহীনতাই তাদের মানসিক হতাশা, উদ্বেগ ও চাপের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ, পুরুষদের মানসিক সুস্থতা সরাসরি তাদের যৌন সক্ষমতা এবং পৌরুষত্বজনিত আত্মপরিচয়ের সাথে জড়িত।
মানসিক বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহাম্মদ শামসুল আহসান বলছেন, বাংলাদেশে সন্তান-কেন্দ্রিক সামাজিক সংস্কৃতির কারণেই এই মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। আমাদের সমাজে বংশরক্ষা ও মাতৃত্বকে নারীর সামাজিক মর্যাদার প্রধান মাপকাঠি ধরা হয়। এর ফলে নারীরা সব সামাজিক ও মানসিক দায় নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন। অন্য দিকে পুরুষদের মানসিক চাপ তাদের যৌন পারফরম্যান্স এবং সামাজিকভাবে পৌরুষত্বের ধারণার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। তবে তিনি বলেন, এই গবেষণাটি হাসপাতালভিত্তিক এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ের ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা। এর মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের সরাসরি ‘কারণ ও ফলাফল’ সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। আবার এইটি গবেষণাটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটায় না। চিকিৎসকদের বলছেন, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় কেবল শারীরিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়, দম্পতিদের জন্য সমন্বিত মানসিক কাউন্সিলিং এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও করতে হবে।



